পরিবেশ রক্ষা ও জাহাজভাঙা শিল্প: সরকারি নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় একটি খাত হলো জাহাজভাঙা শিল্প। বিগত কয়েক দশকে এই শিল্প বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশগত মানদণ্ড বজায় রাখা এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রশ্নে এই শিল্প নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বিশেষ করে পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ঘোষিত নীতি ও পরিকল্পনার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে গৃহীত কিছু উদ্যোগের অসামঞ্জস্যতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশ সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ ছাড়া এই শিল্পের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক এজেন্ডা হিসেবে বিবেচিত। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার অঙ্গীকার করা হয়েছে যে, কোনো শিল্পই পরিবেশের ক্ষতি করে উন্নয়নের মডেল হতে পারবে না। কিন্তু দৃশ্যমান বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই এই অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যে নিয়মাবলী রয়েছে, তা কঠোরভাবে পরিপালন করা জরুরি। অথচ সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগে দেখা যাচ্ছে, পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরিবর্তে ত্বরিত উন্নয়নের নামে নিয়ম শিথিল কিংবা নজরদারিতে ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এটি সামগ্রিক পরিবেশ নীতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজভাঙা শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ, ভারী ধাতু এবং অন্যান্য বিষাক্ত বর্জ্য সঠিক উপায়ে অপসারণ না করা হলে তা উপকূলীয় অঞ্চলের সমুদ্র পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে। গত কয়েক বছরে এই শিল্পের আধুনিকায়নের কথা বলা হলেও ইয়ার্ডগুলোর অধিকাংশতেই আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। সরকারি নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সেগুলো বাস্তবায়নে যে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে উন্নয়নমূলক প্রকল্পের নামে পরিবেশ আইনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বা নিয়ম শিথিল করার মানসিকতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
জাহাজভাঙা শিল্পের আধুনিকায়ন মানে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো নয়, বরং শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন ইয়ার্ড নির্মাণের বিষয়টি অনেক আগে থেকেই আলোচিত হলেও এর সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। সরকার যদি সত্যিই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায়, তবে শিল্পমালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে হবে। কোনো বিশেষ ব্যবসায়িক সুবিধা প্রদানের জন্য পরিবেশের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হলে তা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব এবং এক্ষেত্রে কোনো আপসের অবকাশ থাকার কথা নয়।
ভবিষ্যতের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ রেখে যেতে হলে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ নীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। জাহাজভাঙা শিল্পের ক্ষেত্রে যে অসামঞ্জস্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা নিরসনকল্পে সরকারি সংস্থাসমূহকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকি আরও শক্তিশালী করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। উন্নয়নের স্বার্থে পরিবেশের ক্ষতি স্বীকার করে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নীতি ও কর্মপরিকল্পনার মধ্যে সামঞ্জস্য রেখেই কেবল এই শিল্পকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব জাহাজভাঙা শিল্প গড়ে তোলার পথে হাঁটতে হবে। অন্যথায়, পরিবেশগত বিপর্যয়ের দায়ভার কেবল শিল্পখাতের নয়, গোটা রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]