উড়োজাহাজ কেনাকাটা নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে প্রশ্ন: সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের তাগিদ
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে উড়োজাহাজ কেনাকাটার বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নতুন উড়োজাহাজ কেনার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার চুক্তির আগে যথাযথভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে কি না—এই প্রশ্ন এখন বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংসদীয় কমিটির সদস্যরা মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল অর্থ ব্যয়ে এ ধরনের বড় কোনো সিদ্ধান্তের আগে প্রতিটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
কমিটির বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সদস্য উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তাদের মতে, কোনো একটি সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যখন বড় ধরনের বাণিজ্যিক বা কৌশলগত কোনো চুক্তি করা হয়, তখন তার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন থাকা আবশ্যক। উড়োজাহাজের মতো ব্যয়বহুল সম্পদের ক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালনা ব্যয়, রুটের লাভজনকতা এবং যাত্রী চাহিদার মতো বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। বৈঠকে জানতে চাওয়া হয়, এই কেনাকাটার পূর্বে কোনো স্বাধীন সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দল সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে কি না। যদি করে থাকে, তবে সেই প্রতিবেদনের ফলাফল কী ছিল এবং তা কেনাকাটার সিদ্ধান্তের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেই বিষয়গুলো নিয়েও বিশদ আলোচনার দাবি জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিমান খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে সরকার নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে। তবে এই প্রক্রিয়াটি যেন কোনোভাবেই অহেতুক ব্যয় বা ভবিষ্যতের বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে সংসদীয় কমিটির অভিমত। বৈঠকে উপস্থিত সরকারি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কমিটির সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেনাকাটার প্রতিটি ধাপ নিয়ম মেনেই সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কমিটির সদস্যরা সন্তুষ্ট নন বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। তারা এ ধরনের বড় কেনাকাটার আগে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রতিবেদন আগামী বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংসদীয় কমিটির এই পর্যবেক্ষণকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরকারি কেনাকাটায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সংসদীয় কমিটির এমন ভূমিকা থাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বা এ ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব যেন না থাকে, সে বিষয়ে বারবার তাগিদ দিয়ে আসছে বিভিন্ন মহল। উড়োজাহাজ কেনা একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ, তাই এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়ো না করে যৌক্তিক ও তথ্যনির্ভর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে আরও উঠে এসেছে যে, উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দেওয়ার সময় বৈশ্বিক বাজারের পরিস্থিতি, জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা এবং যাত্রী পরিবহনের বর্তমান ট্রেন্ড মাথায় রাখা হয়েছে কি না। কমিটি আশ্বস্ত করতে চেয়েছে যে, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেনা প্রতিটি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। সংসদীয় কমিটির পরবর্তী কার্যক্রমে এই সম্ভাব্যতা যাচাই সংক্রান্ত কাগজপত্রগুলো পর্যালোচনা করা হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকারের কেনাকাটা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। সব মিলিয়ে, উড়োজাহাজ কেনাকাটার বিষয়টি এখন কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতি ও স্বচ্ছতার এক বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]