বঙ্গোপসাগরে সুইডিশ বিনিয়োগ ও পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারে সহযোগিতার আহ্বান স্পিকারের
বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত বিশাল খনিজ সম্পদ উত্তোলনের লক্ষ্যে সুইডিশ উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে সুইডেনের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহায়তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। রবিবার জাতীয় সংসদ ভবনে নিজের কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় ঢাকায় নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস এবং উইনরকের প্রতিনিধির কাছে স্পিকার এই প্রস্তাব তুলে ধরেন।
বৈঠকের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুই দেশের পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্তরণ। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত তৎপর। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা তেল ও গ্যাসের মজুত আহরণ করা গেলে তা দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বড় ধরনের সাফল্য বয়ে আনবে। সুইডেন বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে, তাই তাদের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে তা দুই দেশের জন্যই লাভজনক হবে। তিনি সুইডিশ রাষ্ট্রদূতকে আশ্বস্ত করেন যে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে একটি ইতিবাচক ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংসদীয় পর্যায়ে সব ধরণের আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।
বিনিয়োগের পাশাপাশি বৈঠকে দেশের অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। স্পিকার বাংলাদেশের বিগত ১৭ বছরের শাসনকালকে একটি সংকটময় অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করে জানান, এই দীর্ঘ সময়ে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধ পথে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই অর্থ উদ্ধার করে জাতীয় অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। এই লক্ষ্যে তিনি মার্কিন সরকারের সরাসরি সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানের ওপর জোর দেন। স্পিকারের মতে, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা কেবল ন্যায়বিচারের দাবি নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতিকে পুনরায় সচল ও শক্তিশালী করার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বৈঠকে মার্কিন সরকারের প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, অর্থ পাচারের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর অবস্থান থাকলে তা অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সাহায্য করবে। মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে সহায়তার আশ্বাস পেলে তা পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আন্তর্জাতিক আইন ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
সুইডিশ রাষ্ট্রদূত এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয়ে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সম্ভাবনা এবং সুইডেনের সহায়তার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন। তিনি জানান, সুইডিশ বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হবে। একইসঙ্গে, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচেষ্টার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন থাকা বাঞ্ছনীয়।
উভয় পক্ষই একমত পোষণ করেছে যে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। সংসদীয় কূটনীতির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশা ব্যক্ত করেন। জাতীয় স্বার্থে এই ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা ও অর্থনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান সরকার বিদেশিদের আস্থা অর্জনের যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, আজকের এই বৈঠক তারই একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। স্পিকারের এই দ্বিমুখী কূটনৈতিক প্রয়াস—একদিকে বিনিয়োগ আকর্ষণ, অন্যদিকে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার—দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে নতুন আশার সঞ্চার করবে বলে মনে করা হচ্ছে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]