রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান প্রকল্পের এলাকায় পৌঁছাল
দেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য আমদানিকৃত পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালানটি সফলভাবে প্রকল্পের নির্ধারিত স্থানে এসে পৌঁছেছে। এই ঘটনা রূপপুর প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের কাজকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই জ্বালানি পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন যে, নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, পারমাণবিক জ্বালানির এই বিশেষ চালানটি গত সোমবার ঢাকায় পৌঁছায়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর অত্যন্ত কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এটি সড়কপথে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নিয়ে আসা হয়। এরপর মঙ্গলবার চালানটি আনুষ্ঠানিকভাবে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় খালাস করা হয়। দেশের কোনো পারমাণবিক প্রকল্পে তেজস্ক্রিয় জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুসরণ করা হয়, যা এই চালানের ক্ষেত্রেও একইভাবে বজায় রাখা হয়েছিল। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রসাটমের সহযোগিতায় এই জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে, যারা শুরু থেকেই প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পটি মূলত দুটি ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত। প্রতিটি ইউনিটের সক্ষমতা প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বড় অংশ মেটাতে সক্ষম এই প্রকল্পটি বর্তমানে নির্মাণের চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি লোড করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেটি এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুতির শেষ ধাপে রয়েছে। এখন দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য জ্বালানি আসায় প্রকল্পের সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হলো। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই চালানটি আসার মানে হলো দ্বিতীয় ইউনিটের রিঅ্যাক্টর বা পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি ভরার প্রাথমিক ধাপটি সম্পন্ন হওয়ার পথ সুগম হলো।
প্রসঙ্গত, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থাপনা। এখানে ব্যবহৃত জ্বালানি পরিবহনের জন্য আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএর নিয়মাবলী কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়। রূপপুর প্রকল্পের জন্য এই জ্বালানি রাশিয়া থেকে আসার পথে আকাশ ও সড়কপথে যে সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়, তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত। সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, পারমাণবিক সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ এবং প্রকল্পের নিজস্ব নিরাপত্তা দল সমন্বিতভাবে এই কাজটি সম্পন্ন করেছে। প্রকল্পটি যখন পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যাবে, তখন এটি জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের বিদ্যুতের জোগান দেবে এবং দেশের লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করছে সরকার।
বর্তমানে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারকরা। প্রথম ইউনিটের কার্যক্রম শুরুর পাশাপাশি দ্বিতীয় ইউনিটের এই অগ্রগতি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনে সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনে এই জ্বালানি চুল্লিতে স্থাপনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হবে। সাধারণ মানুষ এবং দেশের শিল্প খাত এই প্রকল্প থেকে সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার আশায় রয়েছে। এই চালানটির নিরাপদ পৌঁছানো দেশি-বিদেশি সকল অংশীজনের মধ্যে আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে যে, রূপপুর প্রকল্প তার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার দিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে চলছে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]