এলডিসি উত্তরণ: রপ্তানি আয়ের বড় চ্যালেঞ্জ ৬৩৮ কোটি ডলারের ঘাটতি
বাংলাদেশ খুব দ্রুতই স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) গণ্ডি পেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হতে যাচ্ছে। এই উত্তরণ দেশের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিয়ে এলেও অর্থনীতির বড় একটি খাত—পণ্য রপ্তানি—চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক তথ্যমতে, এলডিসি থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণের পর দেশের রপ্তানি আয়ে ৬৩৮ কোটি ডলার পর্যন্ত বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বর্তমানে বাংলাদেশ যেসব অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পায়, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর তার বড় একটি অংশ সংকুচিত হতে পারে।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এলডিসি উত্তরণের ফলে বিদ্যমান বাণিজ্যিক সুবিধাগুলো হারিয়ে যাওয়ার প্রভাব নিয়ে করা একটি উপস্থাপনায় এই আশঙ্কাজনক তথ্যটি উঠে আসে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান এ বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বাজার প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার পরিবর্তে বাধার মুখে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে বাংলাদেশ যেসব শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করে, সেগুলো এলডিসি থেকে উত্তরণের সাথে সাথে বা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে উঠে যেতে পারে। ফলে দেশি পণ্য সেসব বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্কের মুখোমুখি হবে, যা পরোক্ষভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে এবং বিশ্ববাজারে আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দেবে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানি আয়ের এই সম্ভাব্য ঘাটতি সামাল দেওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এর কারণ কেবল শুল্ক সুবিধা হারানো নয়, বরং বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও নিত্যনতুন মানদণ্ড পূরণ করতে না পারা। টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্প খাতের ওপর বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় সিংহভাগ নির্ভরশীল। এলডিসি উত্তরণের পরে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার জন্য যেসব শর্ত পূরণ করতে হয়, সেগুলোর জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এখনই। শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা, কারখানায় কাজের পরিবেশের মান উন্নয়ন এবং পরিবেশগত মানদণ্ড বজায় রাখা—এসব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ৬৩৮ কোটি ডলারের যে ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে, তা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
প্রস্তাবিত এই সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, অর্থাৎ কেবল তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে চামড়া, সিরামিক, ওষুধ ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ। এ ছাড়া, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া দ্রুত করার পরামর্শ দিয়েছে বিএফটিআই। এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সময়ের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। মূলত রপ্তানি আয়ের এই সম্ভাব্য ধাক্কা সামলে নিতে হলে শিল্প মালিকদের উৎপাদন খরচ কমিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে নতুন নতুন বাজার খোঁজার বিকল্প নেই।
সব মিলিয়ে এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হলেও এর সাথে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলো হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সঠিক সময়ে কাঠামোগত সংস্কার ও বাণিজ্যিক কূটনীতি জোরদার করতে পারলে এই ৬৩৮ কোটি ডলারের ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যথায়, দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এখন এই সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ উত্তরণের মূল চাবিকাঠি।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]