রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের সংকট: মনোনয়ন বাণিজ্য ও পারিবারিক নেতৃত্বের আধিপত্য
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে প্রার্থী মনোনয়ন পর্যন্ত প্রতিটি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোতে জবাবদিহিতার জায়গাটি দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের চেয়ে ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পাচ্ছে। বিশেষ করে মনোনয়ন বাণিজ্য এবং পারিবারিক নেতৃত্বের প্রভাব দলগুলোর গঠনতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
রাজনীতিতে মনোনয়ন বাণিজ্য এমন একটি ওপেন সিক্রেট বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যা দলের তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। বিএনপির মতো বড় দলে প্রায় এক দশক ধরে কোনো কাউন্সিল অনুষ্ঠিত না হওয়া অভ্যন্তরীণ স্থবিরতারই বহিঃপ্রকাশ। এই দীর্ঘ সময়ে দলে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার পথ যেমন রুদ্ধ হয়েছে, তেমনি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামতের গুরুত্ব কমে গেছে। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাউন্সিল না হওয়ার বিষয়টি সাংগঠনিক দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একই চিত্র দেখা যায় নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির মতো বড় দলগুলোর ক্ষেত্রেও। অভিযোগ রয়েছে, এই দলগুলোতেও প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে মেধা বা যোগ্যতার চেয়ে আর্থিক লেনদেন ও লবিংয়ের প্রভাব অনেক বেশি শক্তিশালী।
গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু এই তিনটি দলই নয়, দেশের অন্তত দশটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের কাঠামো অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। অধিকাংশ দলেই শীর্ষ নেতৃত্ব বংশপরম্পরায় বা পারিবারিক বলয় থেকে নির্ধারিত হচ্ছে। ক্ষমতার এই কেন্দ্রীভবন দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করছে। যখন কোনো দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা একটি পরিবারের বা অল্প কিছু ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত থাকে, তখন সেখানে সাধারণ কর্মী বা ত্যাগী নেতাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এটি দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট করছে এবং নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি নির্ভর করে তার তৃণমূল কর্মীদের সক্রিয়তা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর। কিন্তু বর্তমানে দেশের অধিকাংশ দলই ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবারের সদস্যদের প্রভাব এতটাই বেশি যে, সেখানে দলের গঠনতন্ত্রের চেয়েও ব্যক্তির ইচ্ছাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হচ্ছে। কাউন্সিল না করার প্রবণতা বা নামকাওয়াস্তে কাউন্সিল করার সংস্কৃতি দলগুলোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। মনোনয়ন বাণিজ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কলুষিত করছে এবং অর্থের বিনিময়ে প্রার্থী নির্বাচনের এই রেওয়াজ দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রাজনৈতিক দলগুলোতে সংস্কারের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় এই সংকট নিরসন হচ্ছে না। জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এবং গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচনের সংস্কৃতি ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত এই অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বকে অবশ্যই তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং তৃণমূলের প্রকৃত অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, গণতান্ত্রিক রাজনীতির যে মূল ভিত্তি, তা নড়বড়ে হয়ে পড়বে এবং সাধারণ জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা আরও হ্রাস পাবে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]