এইচএসসির ফল প্রকাশ: সন্তানের কৃতিত্ব দেখার আগেই নিথর হলো বাবার বুক
অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে। হাজারো পরিবারে এখন মিষ্টি বিতরণের ধুম, কেউবা মেতেছে সাফল্যের আনন্দে। কিন্তু এরই মাঝে একটি পরিবারের অন্দরমহলজুড়ে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। যে সন্তানের সাফল্যে গর্বে বুক ফুলে ওঠার কথা ছিল বাবার, সেই সন্তানের নিথর দেহ এখন মাটির নিচে। ফলাফলের পাতায় সন্তানের উত্তীর্ণ হওয়ার খবরটি যখন সামনে এলো, তখন বাবা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। কান্নায় ভেঙে পড়া সেই বাবার আর্তনাদ যেন আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলেছে।
ঘটনাটি ঘটেছিল গত আগস্ট মাসে। এইচএসসি পরীক্ষার ব্যবহারিক পরীক্ষা চলাকালীন রোজান নামে এক শিক্ষার্থীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচাতে পারেননি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী, চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সেই সময়টা শোকের চাদরে মুড়ে ফেলেছিল পরিবারটিকে। এরপর কেটে গেছে আড়াই মাস। ছেলে বেঁচে নেই, কিন্তু নিয়তির ফেরে সে যে পরীক্ষা দিয়েছিল, তার আনুষ্ঠানিক ফল আজ প্রকাশিত হলো।
পরিবারের আশা ছিল, মৃত্যুর পরেও হয়তো ছেলের ফলাফলটি বিশেষ কোনো বার্তাবাহক হবে। ফলাফলের দিন যখন রেজাল্ট শিটে তার সাফল্যের বিষয়টি নিশ্চিত হলো, তখন সেই শোকের ক্ষত নতুন করে জেগে উঠল। সন্তানের পরীক্ষার খাতা বা রেজাল্ট শিট হাতে নিয়ে এক বাবা যখন দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন তার চোখে ছিল অঝোর ধারা। তার কান্নার শব্দ যেন বলে দিচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত সাফল্য এক নিমিষেই অর্থহীন হয়ে পড়ে যখন সেই অর্জনের পাশে প্রিয় মানুষটি বেঁচে থাকে না। স্বজনরা সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আশেপাশের মানুষও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন এক বাবার অসহায়ত্ব।
এই ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের গল্প নয়, বরং এটি জীবনের চরম অনিশ্চয়তার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় কত স্বপ্ন বুনেছিল, কত সাধনা করেছিল, তার সেই পরিশ্রমের স্বীকৃতি আজ এসেছে, কিন্তু সে নিজে তা দেখার জন্য নেই। শিক্ষাজীবনের এই চূড়ান্ত ধাপ পার করার আনন্দ যখন শোকের মিছিলে পরিণত হয়, তখন সেই কষ্টের পরিমাপ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শিক্ষাঙ্গনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় জীবন কতটুকু ক্ষণস্থায়ী। আজকের ফলাফল প্রকাশের দিনে রোজানের বাবা যে বেদনার মুখোমুখি হলেন, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে কাঁদাবে। তার কান্না যেন নিথর হয়ে যাওয়া সেই মেধাবী শিক্ষার্থীর স্মৃতির প্রতি এক নীরব অশ্রুঞ্জলি। সামাজিক মাধ্যমেও এই ঘটনা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। অনেকেই শোক প্রকাশ করছেন এবং পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছেন। সাফল্যের দিনের এমন এক বিয়োগান্তক চিত্র আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল, জীবনের কোনো অর্জনই প্রিয়জনের জীবনের চেয়ে বড় নয়। এইচএসসির এই রেজাল্ট শিট হয়তো কেবল এক টুকরো কাগজ, কিন্তু বাবার কাছে এটি এখন বেঁচে থাকার এক অবুঝ স্মৃতিচিহ্ন মাত্র।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]