শিশুর কথা বলা: স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক উচ্চারণের ফারাক বোঝার উপায়
একটি শিশুর কথা বলা শেখার পর্যায়টি বাবা-মায়ের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে চিন্তারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিশুরা যখন নতুন নতুন শব্দ শেখে, তখন সেগুলোর উচ্চারণ সব সময় নির্ভুল হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট বয়সের শিশু কিছু কিছু বর্ণ বা শব্দ বিকৃত করে উচ্চারণ করছে। অভিভাবকরা সাধারণত এ ধরনের পরিস্থিতি দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যে, তাদের সন্তান হয়তো কথা বলার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছে। তবে শিশু বিশেষজ্ঞ ও ভাষা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, কথা বলার প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুরা ভুল করবে এটাই স্বাভাবিক। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশিরভাগ শিশু নিজেরাই ধীরে ধীরে সঠিকভাবে শব্দ উচ্চারণ করতে শিখে যায়।
শিশুর ভাষা বিকাশের যাত্রা শুরু হয় একেবারে জন্মের পর থেকে। প্রথমে তারা শুধু কান্না বা অস্পষ্ট আওয়াজ দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করে। এরপর ধীরে ধীরে তারা একেকটি শব্দের অর্থ বুঝতে শেখে এবং সেগুলো অনুকরণ করতে চেষ্টা করে। এই অনুকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যেই ভুল উচ্চারণের সূত্রপাত হয়। শিশুরা সাধারণত বড়দের মুখ থেকে শব্দ শুনে তা আয়ত্ত করে। তাদের বাকযন্ত্র তখনও পুরোপুরি তৈরি থাকে না, যার ফলে উচ্চারণে জড়তা বা ত্রুটি থাকা খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সময়ের সাথে সাথে শিশুর বাকযন্ত্র পরিপক্ক হয় এবং উচ্চারণে স্পষ্টতা আসে। তাই কোনো শিশু একটি নির্দিষ্ট শব্দ বা বর্ণ ভুলভাবে উচ্চারণ করলেই তাকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন নেই।
তবে মা-বাবার মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, কখন এই ভুল উচ্চারণকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাষা বিকাশের একটি নির্দিষ্ট গতিধারা রয়েছে। সাধারণত দুই বছর বয়সের দিকে শিশুরা ছোট ছোট বাক্য তৈরি করতে শুরু করে এবং অপরিচিত ব্যক্তিরাও তাদের কথা অনেকটা বুঝতে পারে। যদি তিন বা চার বছর বয়সের পরেও শিশুর কথা অধিকাংশ মানুষ বুঝতে না পারে, তবে সেটি ভাববার বিষয় হতে পারে। এছাড়া যদি দেখা যায় যে, শিশুটি বয়সের তুলনায় অনেক কম শব্দ জানে, নির্দেশ বুঝতে সমস্যা হচ্ছে অথবা কথা বলার সময় প্রচণ্ড অস্বস্তিতে ভুগছে, তবে দেরি না করে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
শিশুর কথা বলায় স্পষ্টতা আনার জন্য পরিবেশের ভূমিকা অনেক বড়। অভিভাবকদের উচিত শিশুর সাথে নিয়মিত কথা বলা। তাদের সঙ্গে খেলার ছলে ছোট ছোট গল্প করা বা ছড়া শোনানোর মাধ্যমে ভাষার দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। শিশু যখন ভুল শব্দ বলবে, তখন তাকে সরাসরি ধমক না দিয়ে বা ভুল ধরিয়ে না দিয়ে সঠিক শব্দটি বারবার তার সামনে উচ্চারণ করা যেতে পারে। এতে শিশু সঠিক উচ্চারণটি বারবার শোনার সুযোগ পাবে এবং একসময় সে নিজেই সেটি আয়ত্ত করবে। জোর করে বা চাপের মুখে কথা বলাতে গেলে অনেক সময় শিশুর মধ্যে জড়তা তৈরি হতে পারে, যা কথা বলাকে আরও জটিল করে তোলে।
একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন যে, প্রতিটি শিশুর বিকাশের গতি আলাদা। কেউ হয়তো খুব দ্রুত কথা বলতে শিখে যায়, আবার কেউ সময় নেয়। তুলনামূলক বিচার করে নিজের সন্তানকে পিছিয়ে আছে ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পারিবারিকভাবে শিশুর সঙ্গে কথা বলার চর্চা কম থাকলে বা দীর্ঘক্ষণ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সঙ্গে সময় কাটালে শিশুর ভাষা বিকাশে কিছুটা ধীরগতি আসতে পারে। তাই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিশুর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি করা জরুরি।
পরিশেষে, শিশুর কথা বলা বা ভাষা শেখার বিষয়টি ধৈর্য ও অভ্যাসের বিষয়। অভিভাবক হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো শিশুকে কথা বলার জন্য একটি নিরাপদ ও উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশ দেওয়া। যদি দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর মনে হয় যে শিশুর ভাষার উন্নতি একেবারেই হচ্ছে না, তবেই কেবল চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। অহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরলে এবং সঠিক দিকনির্দেশনা মেনে চললে বেশিরভাগ শিশুই সময়ের ব্যবধানে কথা বলার জড়তা কাটিয়ে ওঠে এবং স্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে ওঠে। মনে রাখবেন, শৈশবে ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রে একটুখানি সচেতনতা ও মমতা শিশুর ভবিষ্যতের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]