ডেঙ্গু জ্বরের চরিত্র প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। এক সময় সাধারণ জ্বর হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে এর ভয়াবহতা আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর ধরন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভুল ধারণা এখনো রয়ে গেছে, যা অনেক সময় রোগীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। অনেকে মনে করেন জ্বর কমে যাওয়া মানেই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন, কিন্তু প্রকৃত অর্থে এই সময় থেকেই ডেঙ্গুর মূল ঝুঁকি বা ক্রিটিক্যাল ফেজ শুরু হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, সাধারণত অসুস্থতার তৃতীয় দিন থেকে সপ্তম দিনের মধ্যবর্তী সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে এলেও ভেতরের শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। একেই চিকিৎসকরা ক্রিটিক্যাল ফেজ বা সংকটকাল বলে অভিহিত করেন। জ্বর চলে যাওয়ার পর রোগী যখন মনে করেন তিনি সুস্থ, তখনই শরীরে রক্তচাপ কমে যাওয়া বা রক্তনালী থেকে পানি বেরিয়ে আসার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এই পর্যায়ে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা না নিলে রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে।
ডেঙ্গুর এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আসছেন। মশাবাহিত এই রোগের প্রকোপ নির্দিষ্ট ঋতুতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বছরের বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের পরবর্তী মাসগুলোতে মশা প্রজনন ও ডেঙ্গুর বিস্তার ব্যাপক আকার ধারণ করে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের মতো মাসগুলোতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ভয়াবহ হয়ে ওঠার যে আশঙ্কা গবেষকরা আগেই ব্যক্ত করেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তা মিলে যাচ্ছে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং মশার বংশবিস্তার রোধে অকার্যকর ব্যবস্থাপনার কারণে ডেঙ্গুর মৌসুম এখন দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
সাধারণ লক্ষণ হিসেবে প্রবল জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা বা শরীরে র্যাশ ওঠা থাকলেও বর্তমানে ডেঙ্গুর উপস্থাপনা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্নতর হতে পারে। অনেক সময় রোগীর জ্বর খুব বেশি থাকে না, কিন্তু শারীরিক অবসাদ ও দুর্বলতা থাকে প্রচণ্ড। আবার অনেক ক্ষেত্রে রক্তপাতের মতো দৃশ্যমান লক্ষণ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জ্বর হোক বা না হোক, মশার কামড় থেকে বাঁচতে মশারি ব্যবহার করা এবং বসতবাড়ির আশেপাশে স্বচ্ছ পানি জমতে না দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে বলছেন, জ্বর কমার পরের দিনগুলোতে রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। রোগী যদি হঠাৎ অতিরিক্ত দুর্বল অনুভব করেন, পেটে ব্যথা হয়, অনবরত বমি হতে থাকে, মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তপাত হয় কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়, তবে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি। সাধারণ জ্বরের ওষুধ বা ব্যথানাশক সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক, কারণ ভুল ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ডেঙ্গু এখন কেবল চিকিৎসা খাতের সমস্যা নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সমষ্টিগত সচেতনতাও সমানভাবে প্রয়োজন। বাসার ফুলের টব, এসি কিংবা ফ্রিজের নিচে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা মশার বংশবিস্তার রোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। এছাড়া নগরজীবনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ডেঙ্গুর বিষয়ে সঠিক তথ্য জেনে রাখা এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অসতর্কতার কোনো জায়গা নেই এবং সঠিক সময়ে সচেতনতা অবলম্বনের মাধ্যমেই এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:১৪ অপরাহ্ণ