ক্রসফায়ারের ইঙ্গিত ও পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য: আইনের শাসনের প্রশ্নে উদ্বেগ
রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো আইনের শাসন। যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুলিশ বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব অপরাধ দমন ও শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা। তবে এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনি কাঠামোর ভেতরে থাকাটাই বাধ্যতামূলক। সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকিরের একটি মন্তব্যকে ঘিরে জনপরিসরে প্রবল বিতর্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সরকার অনুমোদন দিলে পুলিশ প্রয়োজনে ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ নিতে পিছিয়ে থাকবে না। এই ধরনের বক্তব্য কেবল উদ্বেগের কারণই নয়, বরং এটি মানবাধিকার ও বিচার ব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও প্রতীয়মান হচ্ছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অপরাধী শনাক্তকরণ, তদন্ত এবং বিচারে সোপর্দ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারেন, তদন্ত করতে পারেন এবং সাক্ষ্য-প্রমাণসহ আদালতে উপস্থাপন করতে পারেন। কিন্তু অপরাধীর বিচার করার একক ও চূড়ান্ত এখতিয়ার আদালতের। সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত দেওয়াটা আইনের শাসনের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ কোনো বাহিনীরই নেই, তা সে যে পর্যায়ের কর্মকর্তাই হোক না কেন। যখন কোনো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এমন বার্তা দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে যে বিবৃতি ও অবস্থান দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে সমালোচকরা বলছেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বৈধতা এক নয়। পুলিশের কাজ হলো অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা, তাকে বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা। এই প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে যদি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে সেটি আইনগত সুরক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অতীতেও বিভিন্ন সময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার হয়েছে। এখন নতুন করে আইজিপির এই বক্তব্য সেই বিতর্ককেই আবার উসকে দিয়েছে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই ভূমিকা হতে হবে গঠনমূলক এবং আইনি সীমার ভেতরে। ক্রসফায়ারের মতো শব্দ যখন কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মুখ থেকে শোনা যায়, তখন তা আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। এটি পুলিশের পেশাদারিত্বকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। নাগরিক অধিকার রক্ষায় যে পুলিশ বাহিনী নিয়োজিত, তারা যখন নিজেরা বিচারকের আসনে বসে পড়ার ইঙ্গিত দেয়, তখন নাগরিক নিরাপত্তার জায়গাটি হুমকির মুখে পড়ে।
সচেতন মহল মনে করছেন, রাষ্ট্র যদি আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে, তবে এই ধরনের বিতর্কিত মন্তব্যের দায়ভার সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনো সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না। আইনি জটিলতা বা দীর্ঘসূত্রতা নিরসনের উপায় বিচার ব্যবস্থার সংস্কার ও পুলিশের তদন্ত পদ্ধতির মানোন্নয়ন, কোনোভাবেই সংক্ষিপ্ত পথে বিচার করা নয়। পুলিশের এই ধরনের বক্তব্য রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ককেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে এবং আইনের শাসন নিশ্চিতে তারা কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]