জয় বাংলা স্লোগান নিয়ে সিপিবি নেতাদের মধ্যে নতুন বিতর্ক
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) শীর্ষ নেতৃত্ব ও দলীয় কর্মীদের মধ্যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ব্যবহারের যথার্থতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে। সম্প্রতি দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন এই ইস্যুতে তার ব্যক্তিগত অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ঘিরেই এখন দলের ভেতরে ও বাইরে নানা মতামতের সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্লোগান ও পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে স্লোগানটির ব্যবহার নিয়ে পার্টির নেতাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২৬ অক্টোবর, সোমবার। ওইদিন সিপিবি সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি মূলত ১৯৭২ সালের পরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটির অবস্থান ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট পার্টি বা সমমনা সংগঠনগুলো ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ব্যবহার করেছে। তবে ১৯৭২ সালের পরবর্তী সময়ে এই স্লোগানটি মূলত একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বা সরকারি দলের স্লোগান হিসেবে পরিচিতি পায় এবং এর প্রয়োগের ধরনেও পরিবর্তন আসে। মূলত এই জায়গা থেকেই বিতর্কটি দানা বেঁধেছে যে, একটি নির্দিষ্ট দলের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়া কোনো স্লোগানকে বামপন্থী আদর্শের একটি রাজনৈতিক দল কতটা ধারণ করতে পারে বা এর রাজনৈতিক অবস্থান কী হওয়া উচিত।
আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতনের এই বক্তব্যের পর থেকেই দলের ভেতর ও বাইরে বিভিন্ন স্তরের নেতাদের মধ্যে মন্তব্যের আদান-প্রদান শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে গেলে স্লোগানটি প্রাসঙ্গিক হতে পারে, আবার অনেকেই মনে করছেন, দলীয় স্বকীয়তা বজায় রাখতে বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব স্লোগান ও স্বতন্ত্র ধারার রাজনীতি থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে ১৯৭২ সালের পরবর্তী সময় থেকে এই স্লোগানটির যে দলীয়করণের অভিযোগ রয়েছে, তা নিয়ে সিপিবি নেতারা কিছুটা দ্বিধাবিভক্ত। কেউ স্লোগানটিকে কেবল মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে দেখতে চাইছেন, আবার কেউ একে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
সিপিবির মতো একটি পুরোনো ও আদর্শিক রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদকের এই ফেসবুক পোস্টটি দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। যদিও এটি সরাসরি কোনো দলীয় সিদ্ধান্ত নয়, তবু একজন শীর্ষ নেতার এমন পর্যবেক্ষণ দলের নেতাকর্মীদের মাঝে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কমিউনিস্ট পার্টির মতো একটি দল যারা সবসময় নিজস্ব মতাদর্শ ও নীতি নিয়ে রাজনীতি করে, তাদের কাছে এ ধরনের স্লোগান বা প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক হওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ, রাজনীতির ময়দানে স্লোগান কেবল শব্দ নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক দলের আদর্শিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবেও কাজ করে।
দীর্ঘদিন ধরে সিপিবি তাদের নিজস্ব স্লোগান ও কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনীতি করে আসছে। সেখানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে হঠাৎ করে এই আলোচনার উৎপত্তি প্রমাণ করে যে, দলের ভেতর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মেলবন্ধন নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ তৈরি হয়েছে। সিপিবি নেতারা এখন একে অপরের সাথে আলোচনা করছেন যে, ভবিষ্যতে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তারা কোনো নির্দিষ্ট স্লোগানকে কীভাবে দেখবেন বা গ্রহণ করবেন। সাধারণ সম্পাদকের এই বক্তব্য কেবল একটি ফেসবুক পোস্টের সীমাবদ্ধতায় থাকেনি, বরং দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আলোচনাতেও এটি প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দলের ভেতরকার এই বিতর্ক কতদূর গড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় কি না, তা এখন দেখার বিষয়। তবে এই ঘটনা নিশ্চিতভাবেই বাম রাজনীতির অঙ্গনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের ব্যবহার ও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে নতুন এক আলোচনার সূচনা করল।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]