অক্টোবর বিপ্লবের ১০৯ বছর: বিশ্বরাজনীতি ও ইতিহাসের মোড় ঘোরানো সেই অধ্যায়
মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু নির্দিষ্ট সময়খণ্ড বা দিন রয়েছে যা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর মতো ঘটনা নয়, বরং গোটা বিশ্বের মানচিত্র এবং রাজনৈতিক মতাদর্শকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। এমনই এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী অধ্যায় ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব। তৎকালীন রাশিয়ার পেত্রোগ্রাদে বলশেভিকদের ক্ষমতা দখলের সেই ঘটনা কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রদবদল ছিল না, বরং তা বিশ্বরাজনীতির গতিপথকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্থান এবং পুঁজিবাদী বিশ্বের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধের যে সূচনা, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক ১০ দিন বা তার আশেপাশের ঘটনাপ্রবাহে।
১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর তারিখটি ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। যদিও তৎকালীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটি ছিল অক্টোবর মাস, বর্তমান গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের হিসেবে এটি নভেম্বরের শুরু। তবে ইতিহাসের পাতায় এটি অক্টোবর বিপ্লব নামেই পরিচিত হয়ে আছে। এই বিপ্লব ছিল রুশ সম্রাট বা জারতন্ত্রের পতন এবং এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের উত্থানের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা পেত্রোগ্রাদে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটিয়েছিল, তা শোষিত মানুষের স্বপ্নপূরণের স্লোগানকে সামনে রেখে সংঘটিত হয়েছিল। ভূমিহীন কৃষক এবং শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হওয়া এই বিপ্লব রাশিয়ার সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দেয়।
বিপ্লবটি একদিনে বা হঠাৎ করে সংঘটিত হয়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্যসংকট এবং জার নিকোলাসের অদূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে রুশ জনমনে যে চরম ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল, তা-ই এই বিপ্লবের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। পেত্রোগ্রাদের শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল একটি পরিবর্তনের আশায়। বলশেভিকরা সেই ক্ষোভকে সংগঠিত করে ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়। এই ক্ষমতা দখলের পর পৃথিবী প্রথমবার প্রত্যক্ষ করে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে উৎপাদনের উপকরণের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ধারণা প্রবর্তন করা হয়।
অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাব কেবল রাশিয়ার সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর ফলে বিশ্বজুড়ে একটি নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়। পশ্চিমা বিশ্বের পুঁজিবাদী শক্তিগুলো এই নতুন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার উত্থানকে নিজেদের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। অন্যদিকে, এশিয়ার বিভিন্ন উপনিবেশ থেকে মুক্তিকামী অনেক দেশ রাশিয়াকে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে দেখতে থাকে। বিংশ শতাব্দীর বেশিরভাগ সময় জুড়ে চলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন স্নায়ুযুদ্ধের মূল কারণগুলো এই ১৯১৭ সালের ঘটনাপ্রবাহেই নিহিত ছিল।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা সেই উত্তাল সময়ের দিকে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি ইতিহাস কীভাবে পুনরাবৃত্তি হয় এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব কত প্রজন্ম ধরে টিকে থাকতে পারে। অনেকের মতে, অক্টোবর বিপ্লব বিশ্বকে শিখিয়েছিল ক্ষমতার উৎস আসলে জনগণের হাতে। যদিও পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু অক্টোবর বিপ্লব যে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সমতার ধারণা বিশ্বমঞ্চে নিয়ে এসেছিল, তা আজও রাজনৈতিক আলোচনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
ঐতিহাসিকদের মতে, ১৯১৭ সালের সেই ঘটনাবহুল দিনগুলো মানবজাতির রাজনৈতিক চেতনাকে এক নতুন স্তরে উন্নীত করেছিল। শ্রেণিহীন সমাজ গঠনের যে তাত্ত্বিক কাঠামো লেনিন ও তাঁর সহযোগীরা সামনে এনেছিলেন, তার বাস্তব রূপায়ন নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। কেউ এটাকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন মনে করেন, আবার কারো দৃষ্টিতে এটি ছিল অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা। তবে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে এটি স্বীকার করতেই হয় যে, অক্টোবর বিপ্লব ছাড়া বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতির রূপরেখা কল্পনা করা অসম্ভব ছিল।
বর্তমান সময়ে বিশ্ব যখন নতুন নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ইতিহাসের এই অধ্যায়টি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা কীভাবে একটি রাষ্ট্রকে আমূল বদলে দিতে পারে। পেত্রোগ্রাদের সেই রাজপথের স্লোগান আর বলশেভিকদের দৃঢ় পদচারণা হয়তো ইতিহাসের পাতায় ধুলো জমেছে, কিন্তু তার প্রভাব আজও বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী বিতর্কের গভীরে রয়ে গেছে। ১০৯ বছর আগের সেই ঘটনা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের চাকা সবসময় সাধারণ মানুষের আকঙ্ক্ষার পথ ধরেই এগিয়ে চলে, তা সময় সাপেক্ষে রূপ পাল্টালেও মূল সুরটি অপরিবর্তিত থাকে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]