বন্ধ ঘরে ধুলোর উপদ্রব: অদৃশ্য কারণ ও মুক্তির উপায়
অধিকাংশ মানুষের ধারণা, বাইরের বাতাস বা রাস্তার ধুলোবালির কারণেই ঘরের আসবাবপত্রে ধুলো জমে। বিশেষ করে যারা ব্যস্ত রাস্তার পাশে বসবাস করেন, তারা এই সমস্যায় সবচেয়ে বেশি জর্জরিত হন। কিন্তু আধুনিক আবাসন ব্যবস্থায় দেখা যাচ্ছে, জানালা ও দরজা সতর্কতার সঙ্গে বন্ধ রাখার পরেও মেঝে, সোফা কিংবা আলমারিতে ধুলোর আস্তরণ জমছে। এই সমস্যার মূলে যাওয়ার জন্য আমাদের ঘরের ভেতরের পরিবেশ ও অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। অন্দরসজ্জা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধুলোর বড় অংশ বাইরের চেয়ে ঘরের ভেতরের বিভিন্ন বস্তু থেকেই উৎপন্ন হয়।
আমাদের শোয়ার ঘরের তোশক, গদি, বালিশ এবং পরনের কাপড় থেকে নিয়মিত প্রচুর পরিমাণে সূক্ষ্ম তন্তু বা ফাইবার নির্গত হয়। এই তন্তুগুলো বাতাসের সঙ্গে মিশে ধুলোর রূপ নেয়। এ ছাড়া ভারী পর্দা বা কার্পেট ধুলো ধরে রাখার এক বড় আধার। নিয়মিত ঝাড়পোঁছ বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের ব্যবহার না করলে পর্দা ও কার্পেট থেকে ধুলো সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। তাই অন্দরসজ্জার অংশ হিসেবে এসব উপকরণের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
বইয়ের তাক বা শেলফও ধুলো জমার বড় একটি উৎস। কাগজের নিজস্ব ক্ষয় ও পুরনো বইয়ের থেকে নির্গত সূক্ষ্ম কণা ধুলো তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বই নিয়মিত নাড়াচাড়া না করলে বা বইয়ের তাক ঢাকা না থাকলে সেখানে প্রচুর ধুলো জমা হওয়া স্বাভাবিক। এ ছাড়া, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার না করলে সেখান থেকেও ধুলো সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এসি বাতাস চলাচলের সময় ফিল্টারে আটকে থাকা পুরনো ধুলো নতুন করে বাতাসে মিশিয়ে দেয়, যা পরে ঘরের বিভিন্ন কোণায় থিতু হয়।
ঘরের ধুলো কমানোর জন্য কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। প্রথমেই ঘরের ভেতরে অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র বা শো-পিস কমানোর চেষ্টা করা উচিত। আসবাবের সংখ্যা যত বেশি হবে, ধুলো জমার জায়গা তত বাড়বে। বিছানার চাদর ও বালিশের কভার সপ্তাহে অন্তত একবার পরিবর্তন করা এবং ধুয়ে ফেলা স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। তোশক বা গদি মাঝে মাঝে রোদে দেওয়া ধুলো কমানোর প্রাচীন অথচ কার্যকর উপায়।
ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করার সময় হেপা (HEPA) ফিল্টারযুক্ত মেশিন বেছে নেওয়া ভালো। এটি সূক্ষ্ম ধুলিকণা আটকে রাখতে কার্যকর। ঘর মোছার সময় শুকনো কাপড় ব্যবহার না করে ভেজা কাপড় বা মপ ব্যবহার করা উচিত। শুকনো কাপড়ে ঝাড়ু দিলে ধুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায়, যা পরবর্তীতে আবার আসবাবের ওপরই পড়ে। ভেজা মোছার ফলে ধুলো কাপড়ের সঙ্গে আটকে যায় এবং ঘর পরিষ্কার থাকে।
পাশাপাশি ঘরের ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার দিকেও খেয়াল রাখা দরকার। সব সময় জানালা বন্ধ রাখা সবসময় ভালো সমাধান নয়। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে জানালা খুলে দিলে ঘরের ভেতরের বদ্ধ বাতাস বেরিয়ে যায়, যা ধুলো ও অ্যালার্জেন কমাতে সাহায্য করে। তবে ধুলোবালির আধিক্য থাকলে জানালা খোলার সময় সূক্ষ্ম জালের পর্দা ব্যবহার করা যেতে পারে।
পরিশেষে, ধুলোবালি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ঘর পাওয়া কঠিন হলেও, সঠিক পরিকল্পনায় এর মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রতিদিনের রুটিনে ঘর গোছানো এবং আসবাবপত্রের নিয়মিত যত্নের মাধ্যমে ঘরের পরিবেশকে স্বাস্থ্যসম্মত ও আরামদায়ক রাখা সম্ভব। কেবল বাইরের দূষণ নিয়ে চিন্তিত না হয়ে, ঘরের ভেতরের অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করলে ধুলোর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হবে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]