দাবানলের ধোঁয়া থেকে বাঁচতে ইন্দোনেশিয়ায় বিশেষ ‘অক্সিজেন বাস’
ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপে ভয়াবহ দাবানলের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দীর্ঘস্থায়ী এই দাবানল থেকে নাগরিকদের শ্বাসকষ্ট ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এই পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত ‘অক্সিজেন বাস’ সেবা চালু করা হয়েছে। মূলত সেন্ট্রাল কালিমানতান প্রদেশের পালাংকা রায়া শহরে এই বাসগুলো চলাচল করছে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন এই শহরটিতে সাধারণ মানুষের শ্বাস নিতে যে কষ্ট হচ্ছে, তা থেকে সাময়িক স্বস্তি দিতেই নীল ও সাদা রঙের এই বাসগুলো রাস্তায় নামানো হয়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব বাসে অক্সিজেন সিলিন্ডারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং একই সঙ্গে সেখানে সার্বক্ষণিক চিকিৎসাকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। দাবানলের ধোঁয়ায় আক্রান্ত বাসিন্দারা এই বাসে উঠে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সেবা নিতে পারছেন। একজন সাধারণ নাগরিককে অন্তত পাঁচ থেকে দশ মিনিটের জন্য অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কিছুটা রেহাই পান। যারা দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকার কারণে কাশির সমস্যায় ভুগছেন বা শ্বাস নিতে কষ্ট বোধ করছেন, তাদের জন্যই মূলত এই সেবা চালু করা হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় দাবানল নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে এবারের পরিস্থিতি এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সুমাত্রা ও বোর্নিও দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এই আগুনের ধোঁয়া শুধু ইন্দোনেশিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রতিবেশী দেশ মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের আকাশও কমলা রঙের ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, আগুন নেভানোর কোনো আশু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রকৃতির এই দুর্যোগের সামনে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব ফুটে উঠছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তারা বাধ্য হয়েই এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন, যদিও তাদের করার তেমন কিছু নেই।
দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এই দুর্যোগের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগস্ট মাস থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে দাবানলের কারণে সৃষ্ট শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র সেন্ট্রাল কালিমানতান প্রদেশেই প্রায় ৩১ হাজার মানুষ শ্বাসজনিত জটিলতায় ভুগে চিকিৎসার শরণাপন্ন হয়েছেন। রোগীদের ক্রমবর্ধমান এই চাপ সামাল দিতেই সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অক্সিজেন বাসসহ বিভিন্ন জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি দাবানল দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের জন্য এই ধোঁয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অক্সিজেন বাস চালুর এই উদ্যোগ আপাতত কিছু মানুষকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে দাবানল নেভানোর ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। পালাংকা রায়া শহরের রাস্তায় চলাচলরত এই বাসগুলো যেন একরকম চলমান হাসপাতালের ভূমিকা পালন করছে, যা দুর্যোগের এই দুঃসময়ে মানুষের কাছে ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এই বিশেষ সেবা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]