অবিশ্বাস্য প্রাণশক্তি: পায়ে ক্ষত নিয়ে নিজেই অস্ত্রোপচার, ড্রোন ব্যবহার করে মৃত্যুপুরী থেকে ফেরা ইউক্রেনীয় সেনা
ইউক্রেন-রাশিয়া চলমান যুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাসে বহু বীরত্বগাথা ও করুণ পরিণতির গল্প ছড়িয়ে আছে। তবে সম্প্রতি যে ঘটনার কথা সামনে এসেছে, তা যেন হার মানায় সিনেমার চিত্রনাট্যকেও। এক ইউক্রেনীয় সেনা তার অসীম সাহস ও টিকে থাকার ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে মৃত্যুপুরী থেকে কেবল ফিরে আসাই নয়, বরং চিকিৎসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রবল প্রতিকূলতার মাঝে নিজের আঘাতপ্রাপ্ত পা নিজেই অস্ত্রোপচার করে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করার মতো দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নেন এই যোদ্ধা। এরপর প্রযুক্তির আধুনিক ব্যবহারে একটি ড্রোনকে বাহন বানিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছান তিনি।
যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হওয়ার পর দীর্ঘ আট মাস চরম বিপর্যয়ের মধ্যে কাটিয়েছেন এই সেনা। জানা গেছে, তিনি একটি বয়লারের ভেতরে অত্যন্ত গোপনে অবস্থান করছিলেন। বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন এই আট মাস তার জন্য ছিল এক দীর্ঘ লড়াই। সেই গর্তের অন্ধকারে বসেই নিজের ক্ষতবিক্ষত পা নিজেই অস্ত্রোপচার করেন তিনি। সাধারণ কোনো সরঞ্জাম দিয়ে এই কাজ করা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কিন্তু বাঁচার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণাটুকু কাজে লাগিয়ে নিজের অঙ্গহানি করতেও তিনি পিছপা হননি।
নিজের পা অস্ত্রোপচার করে বিচ্ছিন্ন করার পর তার প্রয়োজন ছিল দ্রুত নিরাপদ স্থানে পৌঁছানো, কারণ ওই অবস্থায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। সেই সংকটময় মুহূর্তে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি তার জন্য এক নতুন আশার আলো হয়ে দাঁড়ায়। ছয় পাখার একটি বিশাল ড্রোনের সাথে নিজেকে যুক্ত করে আকাশপথকে বেছে নেন তিনি। প্রায় ১৫ কিলোমিটারের আকাশপথ পাড়ি দিয়ে তিনি অবশেষে পৌঁছান নিরাপদ আশ্রয়ে। ড্রোনটির নিখুঁত পরিচালনার মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করে আনা হয় ধ্বংসস্তূপ আর মৃত্যুর হাতছানি থেকে।
ইউক্রেনীয় এই সেনার এই অসাধ্য সাধনের ঘটনাটি আধুনিক সামরিক ইতিহাসের একটি আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি এবং মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি কীভাবে চরম বিপদের দিনে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট। তার এই কাহিনি যেমন একদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তুলে ধরছে, তেমনি অন্যদিকে মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য জেদকেও সামনে নিয়ে এসেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোন শুধু নজরদারি বা আক্রমণের জন্য নয়, বরং এই ধরনের জীবন রক্ষাকারী অপারেশনেও যে দারুণ কার্যকর হতে পারে, তা আবারও প্রমাণিত হলো।
দীর্ঘ আট মাস বয়লারের গর্তে লুকিয়ে থাকার দিনগুলোতে তিনি কী পরিমাণ মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন, তা কল্পনা করাও দুষ্কর। খাবার ও পানির অভাব, নিয়মিত চিকিৎসা না পাওয়া এবং সব সময় শত্রুসৈন্যের আক্রমণের আতঙ্ক—এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা ছিল এক মহাকাব্যিক লড়াই। এই সেনা বর্তমানে নিরাপদে আছেন এবং তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। তার এই ফেরার পথ ছিল কন্টকাকীর্ণ, কিন্তু প্রযুক্তি আর সাহসের মেলবন্ধনে তিনি আজ এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তার এই ঘটনা সারা বিশ্বে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং প্রতিকূলতায় টিকে থাকার নজির হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]