রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষুব্ধ হাইকোর্ট: নীরব দর্শক হওয়া যায় না
বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবার মান, টিকিট কালোবাজারি এবং যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে হাইকোর্ট। সম্প্রতি এক শুনানিকালে আদালত বাংলাদেশ রেলওয়ের এমন অব্যবস্থাপনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে অভিহিত করেছে। আদালত স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, রেল কর্তৃপক্ষ এই অনিয়ম দেখেও নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না। মূলত ট্রেনের ছাদে যাত্রী পরিবহন এবং টিকিট কালোবাজারি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন আদালত।
দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে রেলওয়ে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই রেলের যাত্রীসেবা এবং টিকিট ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ তুঙ্গে। ট্রেনের ছাদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের যাতায়াতের বিষয়টি নতুন নয়, কিন্তু বারবার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও এটি বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। হাইকোর্ট এদিন শুনানিতে প্রশ্ন তোলে, কীভাবে ট্রেনের ছাদে মানুষ চড়ে যাতায়াত করে এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এই দৃশ্য দেখার পরেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে না? আদালতের মতে, এটি কেবল অবহেলা নয়, বরং দায়িত্বহীনতার চরম নিদর্শন।
টিকিট কালোবাজারি রেলওয়ের আরেকটি বড় সংকট। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, অনলাইনে কিংবা স্টেশনের কাউন্টারে টিকিট পাওয়া দুষ্কর, অথচ অতিরিক্ত মূল্যে তা সহজেই মিলছে কালোবাজারে। এর পেছনে রেলওয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। হাইকোর্ট এই টিকিট সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং যাত্রীদের হয়রানি কমাতে কঠোর নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, যাত্রীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা রেল কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব, যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, যাত্রী সাধারণের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। ট্রেনের ছাদে যাত্রী পরিবহন কেবল আইনবিরোধীই নয়, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনকও বটে। সামান্য ভুলের কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এমন অবস্থায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা অগ্রহণযোগ্য। হাইকোর্ট রেলওয়েকে অবিলম্বে এমন অনিয়ম বন্ধে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছে।
শুনানিকালে আদালত আরও উল্লেখ করেছে যে, রেলওয়ে একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত এই সংস্থায় সেবার মান নিশ্চিত করা ও দুর্নীতিমুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বারবার একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে, কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক তদারকির অভাব রয়েছে। ভবিষ্যতে রেলওয়েকে তাদের সেবার মানোন্নয়নে এবং সকল প্রকার টিকিট জালিয়াতি রোধে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে বলেও আদালত মত প্রকাশ করেছে।
পরিশেষে, রেলওয়ের এই অব্যবস্থাপনা নিয়ে হাইকোর্টের এই মন্তব্য সাধারণ যাত্রী ও সচেতন মহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। আশা করা হচ্ছে, আদালতের এই নির্দেশনার ফলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে যাত্রীদের নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা প্রদানে আরও তৎপর হবে। দুর্নীতি ও অনিয়ম নির্মূলে দায়িত্বশীলরা যদি এখন থেকেই কঠোর অবস্থান না নেয়, তবে জনদুর্ভোগ কমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]