নোবেল না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ ট্রাম্পের নিশানায় নরওয়ে
বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিলেন তিনি। নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে এবার নরওয়ের মতো একটি শান্তিকামী ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, আগামী সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মিশিগানের পোর্ট হুরনে আয়োজিত এক নির্বাচনি জনসভায় এই বিতর্কিত বক্তব্য দেন তিনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই মন্তব্য কেবল নরওয়ের প্রতি তার বিদ্বেষকেই প্রকাশ করে না, বরং এটি তার নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
ঘটনার সূত্রপাত নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়ন ও চূড়ান্ত বিজয়ীদের নাম ঘোষণার পর থেকে। আন্তর্জাতিক মহলে শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে যে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি দেওয়া হয়, সেখানে নিজের নাম দেখতে না পাওয়ায় ট্রাম্প বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে জানা গেছে। নরওয়ের রাজধানী ওসলোতে অবস্থিত নোবেল কমিটি তাকে কেন মনোনীত করেনি বা কেন তিনি এই পুরস্কারের জন্য যোগ্য বিবেচিত হননি, তা নিয়ে তিনি বারবার অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। এর ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক ভাষণে তিনি নরওয়েকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত অশালীন ও আপত্তিকর শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন, যা মূলত একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বা দেশের মানহানি করার শামিল। তিনি নরওয়েকে ‘নোংরা’ দেশ বা ইংরেজি পরিভাষায় শিট হাউস কান্ট্রি হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের প্রভাব শুধু নরওয়ের ওপর সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রেও তার কঠোর মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়। ভাষণে তিনি পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন যে, নরওয়ের অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের কোনো জায়গা হবে না বা তাদের স্বাগত জানানো হবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে এমন মন্তব্য বিশ্বজুড়ে অভিবাসনপ্রত্যাশী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। নরওয়ে মূলত তার উন্নত জীবনযাত্রার মান, মানব উন্নয়ন সূচকে শীর্ষস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। সেই দেশের নাগরিকদের প্রতি এমন বৈষম্যমূলক আচরণ মার্কিন প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মিশিগানের ওই নির্বাচনি প্রচারণায় ট্রাম্পের এই ধরনের বক্তব্যের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভোটব্যাংক ধরে রাখার কৌশল থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি ভোটারদের মেরুকরণ করতে চাইছেন। অভিবাসন ইস্যু সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি ময়দানে উত্তপ্ত থাকে। ট্রাম্প সম্ভবত তার সমর্থকদের একটি অংশের কাছে নিজেকে ‘কঠোর অভিবাসনবিরোধী’ নেতা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টায় এমন উস্কানিমূলক কথা বলেছেন। তবে এই ধরনের শব্দচয়ন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে।
নরওয়ের মতো একটি দেশের প্রতি এই ধরণের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কেন তৈরি হলো, তা নিয়ে এখন নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। বিশেষ করে নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাষ্ট্রপ্রধানের এই ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও তার বহিঃপ্রকাশ গণতন্ত্র ও মুক্তমতের চর্চায় কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কোনো রাষ্ট্রপ্রধান যখন ব্যক্তিগত প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তি নিয়ে অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে হেয় প্রতিপন্ন করেন, তখন তা কেবল ওই দেশ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের মানের ওপরই প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর নরওয়ে বা নর্ডিক দেশগুলোর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও, বিশ্ব রাজনীতি সচেতন মহল এটি নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু করেছে।
পরিশেষে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, বিশ্ব রাজনীতিতে কূটনীতির চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ অনেক সময় বড় ভূমিকা পালন করে। শান্তি পুরস্কারের মতো একটি সম্মানজনক বিষয়ের সাথে একটি দেশের সম্মানকে জড়িয়ে ফেলা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। তবে এটি নিশ্চিত যে, এই মন্তব্যটি শুধুমাত্র ওসলোতে নয়, বরং সারা বিশ্বের কূটনৈতিক মহলে বড় ধরনের আলোচনার খোরাক জোগাল। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনের পথচলায় এই বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো কূটনৈতিক চাপে পড়তে হয় কিনা বা নরওয়ের সাথে তাদের সম্পর্কের সমীকরণ কীভাবে পরিবর্তিত হয়।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]