যৌবনের স্বপ্ন পুনর্জীবিত: ১৫ বছর পর গৃহবধূ রীতি খাতুনের এইচএসসি জিপিএ‑৫
যৌপুরহাটের কেটলাল উপজেলার নসিরপুর গ্রাম থেকে আসা রীতি খাতুন, ৩০ বছর বয়সী গৃহবধূ, ১৫ বছর দীর্ঘ বিরতির পর আবার শিক্ষার পথে পা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ‑৫ অর্জন করেছেন। তার এই সাফল্য স্থানীয় সমাজে নারীর শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার নতুন আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।
রীতি খাতুনের জীবনের প্রথম দিকেই পরিবারিক দায়িত্বের ভার তার ওপর নেমে আসে। স্বামী আব্দুল আলিম মণ্ডল বাবুর সঙ্গে বিবাহের পর তিনি সন্তান পালন, গৃহস্থালির কাজ এবং পরিবারের আর্থিক চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত ছিলেন। এই সময়ে তার স্বপ্ন ছিল নিজের পড়াশোনাকে অব্যাহত রাখা, তবে বাস্তবতার চাপ তাকে শিক্ষার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
বছরের পর বছর, স্বামীর উৎসাহে রীতি আবার শিক্ষার প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তোলেন। স্বামী তাকে পুনরায় ভর্তি হতে সাহায্য করেন এবং পরিবারের সমর্থন পেয়ে তিনি আবার স্কুলে ফিরে যান। দীর্ঘ ১৫ বছরের বিরতি সত্ত্বেও, রীতি ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেন, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক পাঠ্যক্রমের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় রীতি খাতুনের ফলাফল বিশেষ দৃষ্টিনন্দন। জিপিএ‑৫ অর্জন করা তার কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি, যা দেখায় যে দীর্ঘ বিরতি সত্ত্বেও সঠিক মনোভাব ও সমর্থন থাকলে শিক্ষায় ফিরে আসা সম্ভব। তার সাফল্য কেবল তার নিজের জন্য নয়, গ্রামাঞ্চলের অন্যান্য নারীদের জন্যও প্রেরণার উৎস।
স্থানীয় শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা রীতি খাতুনের উদাহরণকে প্রশংসা করে বলেন, “যদি রীতি মতো গৃহবধূ দীর্ঘ বিরতির পরও উচ্চমানের ফলাফল অর্জন করতে পারেন, তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের দায়িত্ব হল নারীদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং তাদের পুনরায় শিক্ষায় প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।”
রীতি নিজে বলেন, “বছরের পর বছর গৃহকর্মে ব্যস্ত থাকলেও আমার স্বপ্ন কখনো ম্লান হয়নি। স্বামীর সমর্থন ও নিজের দৃঢ়সংকল্প আমাকে আবার শিক্ষার পথে ফিরিয়ে এনেছে। এখন আমি আমার সন্তানদের জন্য একটি ভালো উদাহরণ হতে চাই, যাতে তারা জানে যে কোনো বাধা অতিক্রম করে স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব।”
রীতি খাতুনের এই সাফল্য স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তারা এখন গ্রামাঞ্চলে নারীর শিক্ষার জন্য বিশেষ স্কলারশিপ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা করছে, যাতে রীতি মত নারীরা আর বাধা ছাড়াই শিক্ষার পথে অগ্রসর হতে পারে।
এই ঘটনাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে শিক্ষা কোনো বয়সের সীমা জানে না, এবং পরিবারিক সমর্থন ও ব্যক্তিগত দৃঢ়সংকল্পের মাধ্যমে যে কোনো সময়ে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তর করা সম্ভব। রীতি খাতুনের গল্প নারী শিক্ষার পথে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা ভবিষ্যতে আরও অনেক গৃহবধূকে শিক্ষার পথে ফিরে আসতে উদ্বুদ্ধ করবে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]