বিএনপিতে পদ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনে প্রতারণা, গ্রেফতার সাবেক ছাত্রলীগ নেতা
রাজনৈতিক পদ-পদবি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে প্রতারণার একটি বড় চক্রের সন্ধান মিলেছে নাটোর জেলায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম এবং পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতারকৃত ওই ব্যক্তি অতীতে ছাত্রলীগে সক্রিয় ছিলেন বলে জানা গেছে। প্রতারণার অভিনব কৌশল অবলম্বন করে তিনি বিভিন্ন মানুষকে বিএনপিতে পদ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখাতেন, যা নিয়ে জনমনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযানে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির নাম আবু হুরায়রা, যাকে অনেকে খালেদ বা রাশেদ নামেও চিনতেন। তার বয়স ৩০ বছর। তিনি নাটোরের সিংড়া উপজেলার বাসিন্দা। তার বাবার নাম জিয়াদুল ইসলাম এবং বাড়ি সিংড়া শহরের বালুয়া বাসুয়া মহল্লায়। দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা নজরদারির পর শুক্রবার দিবাগত রাতে পুলিশ তার নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবু হুরায়রা নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের ব্যক্তিগত সহকারী বা স্টাফ হিসেবে পরিচয় দিতেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তিনি কৌশলে বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতেন। মূলত যারা বিএনপিতে ভালো কোনো পদ পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতেন, তাদেরই টার্গেট করতেন তিনি। রাজনৈতিকভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে মিথ্যা আশ্বাস দিতেন এবং এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রতারক চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে অভিযোগ আসছিল। বিশেষ করে ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি দপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা এবং সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি তাদের নজরে আসে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন প্রতারণার ঘটনা নতুন নয়, তবে বড় ধরনের রাজনৈতিক পদ বা প্রভাব বিস্তারের নাম করে এ ধরনের ডিজিটাল জালিয়াতি সমাজে উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, অনেক সময় ভুক্তভোগীরা লজ্জায় বা পরিস্থিতির চাপে এসব বিষয়ে মুখ খোলেন না, যা প্রতারকদের আরও সাহসী করে তোলে। আবু হুরায়রার রাজনৈতিক অতীত, বিশেষ করে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রবণতা যে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে, এই ঘটনা তারই একটি প্রতিফলন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্যমতে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রতারণার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে পুরো চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই চক্রের অন্যান্য সদস্যদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ প্রচলিত আইনে তার বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
সিংড়া এলাকাতে তার এই কর্মকাণ্ড এতদিন ধরে কীভাবে চলল এবং তিনি আর কতজনকে প্রতারিত করেছেন, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। সাধারণ মানুষকে যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়া বা সরকারি দপ্তরের নাম ভাঙিয়ে কেউ যোগাযোগ করলে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। তারা জানিয়েছেন, কোনো ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে এবং দাপ্তরিক যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো আর্থিক লেনদেনে না জড়ানোর জন্য বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও মানুষ প্রলোভনের শিকার হচ্ছে। এই গ্রেফতারের মাধ্যমে একটি প্রতারক চক্রের মূলোৎপাটন সম্ভব হবে বলে আশা করছে পুলিশ।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]