ভালো বন্ধু নির্বাচনে সচেতনতা এবং ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
মানুষের জীবনে চলার পথে বন্ধুত্বের প্রভাব অপরিসীম। শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত আমরা নানা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই, কিন্তু সবার সঙ্গ আমাদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না। বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্কদের পারস্পরিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই সঠিক বন্ধু নির্বাচন আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে বড় ভূমিকা পালন করে। সঠিক বন্ধু বা ভালো ‘বন্ধু-সার্কেল’ কীভাবে তৈরি করবেন এবং এর গুরুত্ব কতটা, তা নিয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তাভাবনা করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানদের আচরণের ওপর বন্ধুর প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় তারা নিজেদের আলাদা একটি জগত তৈরি করতে চায় এবং পরিবারের চেয়ে বন্ধুদের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো সন্তানকে ভালো ও ক্ষতিকর বন্ধুর পার্থক্য বুঝতে শেখানো। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, যাতে তারা যেকোনো বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে। তারা কাদের সঙ্গে মেলামেশা করছে, তাদের আচরণের ধরন কেমন, এসব বিষয়ে সরাসরি খবরদারি না করে বরং কৌশলে নজর রাখা উচিত। সন্তানকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন তারা নিজের ভালো-মন্দের বিচার করতে শেখে এবং ভুল পথে চালিত বন্ধুদের থেকে সতর্ক থাকতে পারে।
ইসলামি দর্শনে বন্ধুত্বের গুরুত্ব অনেক বেশি। ইসলামে বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সততা, নৈতিকতা এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়েছে। একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, শেষ বিচারের দিনে আল্লাহর আরশের নিচে যারা ছায়া পাবেন, তাদের মধ্যে সেই দুই বন্ধুও অন্তর্ভুক্ত, যারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালোবেসেছেন। তাদের এই ভালোবাসার ভিত্তি ছিল কেবল ধর্মীয় মূল্যবোধ। তারা আল্লাহর জন্য একত্র হয়েছেন এবং আল্লাহর জন্যই আবার বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। অর্থাৎ, প্রকৃত বন্ধুত্বের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত একে অপরকে সৎপথে রাখা এবং পরকালের পাথেয় অর্জনে সহায়তা করা।
বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে কেবল স্বার্থসিদ্ধি বা আনন্দ-ফূর্তির চিন্তাভাবনা করলে দীর্ঘমেয়াদে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। যারা জীবনের কঠিন সময়ে পাশে থাকে এবং ভালো কাজে উৎসাহিত করে, তারাই প্রকৃত বন্ধু। ভালো বন্ধু বা বন্ধু-সার্কেল গড়ে তোলার প্রক্রিয়াটি মূলত পারস্পরিক বিশ্বাস ও অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের ওপর নির্ভর করে। কোনো ব্যক্তি যখন এমন কোনো বন্ধু খুঁজে পায় যার সঙ্গে তার আদর্শিক মিল রয়েছে এবং যে তাকে ভুল থেকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম, তখন সেটিই জীবনের এক বড় প্রাপ্তি।
বন্ধুত্ব মানেই কেবল একসঙ্গে আড্ডা দেওয়া বা সময় কাটানো নয়; বরং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং একে অপরের উন্নয়নে সাহায্য করার মানসিকতা থাকা। বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে এই শিক্ষাটি আরও বেশি প্রয়োজন। কারণ, ভুল পথে ধাবিত বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীও জীবনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়। তাই পরিবারের পক্ষ থেকে সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, তাদের সঙ্গীদের ব্যাপারে সচেতন থাকা এবং তাদের মধ্যে এই বোধ তৈরি করা প্রয়োজন যে, ভালো বন্ধুর সঙ্গে চললে মানুষ নিজেও ভালো হয়ে ওঠে।
পরিশেষে, বন্ধুত্ব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও তা নির্বাচনের সময় সতর্কতা অবলম্বন করা বুদ্ধিমানের কাজ। ইসলামি মূল্যবোধ হোক বা আধুনিক মনস্তত্ত্ব—সবখানেই সৎসঙ্গের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ভালো বন্ধু নির্বাচন কেবল আমাদের বর্তমান জীবনকে সুন্দর করে না, বরং আমাদের চরিত্র ও ব্যক্তিত্বকে উন্নত করে। তাই বন্ধু সার্কেল তৈরি করার সময় এমন মানুষ বেছে নেওয়া উচিত, যারা আমাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে এবং দুঃসময়ে পাশে থাকবে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]