অশিক্ষিত হওয়ার কারণে প্রায়ই শুনতে হতো কটু কথা। এক ব্যক্তির করা অপমানজনক মন্তব্য যেন হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিল রাজুর। তখন থেকেই নিজেকে প্রমাণ করার জেদ চেপে বসে তার মাথায়। পেশায় নাপিত হলেও জ্ঞানের পিপাসাকে তিনি দমন করতে পারেননি। অপমানের জ্বালায় ভেঙে না পড়ে সেই গঞ্জনার জবাব দিতে তিনি বেছে নিয়েছেন বইয়ের জগতকে। এখন রাজুর সেলুনে গেলেই দেখা মেলে সারি সারি বইয়ের তাক, যা আজ একটি লাইব্রেরিতে রূপ নিয়েছে। এলাকার মানুষের কাছে রাজুর এই উদ্যোগ এখন দারুণ প্রশংসিত হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত অনেকদিন আগে। সেলুনে কাজ করার সময় এক খদ্দের তাকে বলেছিলেন, তুমি নাপিত, তুমি অশিক্ষিত, তুমি আমার সাথে কী কথা বলবে। এই বাক্যটি রাজুর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। কিন্তু তিনি সেই ক্ষোভকে প্রতিশোধে রূপ না দিয়ে সৃজনশীল কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ভেবেছিলেন, শিক্ষার অভাবে মানুষ যদি তাকে নিচু চোখে দেখে, তবে তিনি নিজেই নিজের পড়াশোনার ব্যবস্থা করবেন এবং অন্যদেরও পড়ার সুযোগ করে দেবেন। সেই ভাবনা থেকেই তিনি নিজের উপার্জিত অর্থের একটি অংশ দিয়ে বই কেনা শুরু করেন।
বর্তমানে রাজুর সেলুনে প্রবেশের পর অন্য আট-দশটি চুল কাটার দোকানের মতো শুধু কাঁচি আর চিরুনির আওয়াজই পাওয়া যায় না। এখন সেখানে ঢুকলে বইয়ের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। দোকানের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা কাঠের তাকে সাজানো আছে বিভিন্ন ধরনের বই। এখানে ছোট গল্প, উপন্যাস থেকে শুরু করে জীবনমুখী ও সাধারণ জ্ঞানের বইয়ের সমাহার রয়েছে। চুল কাটার অপেক্ষায় থাকা খদ্দেররা এখন আর অহেতুক বসে থাকেন না। কেউ কেউ হাত বাড়িয়ে নিচ্ছেন পছন্দের বইটি, আবার কেউ সময় কাটচ্ছেন পত্রিকা পড়ে।
এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, আগে সেলুনে গেলে মানুষ নানা ধরনের আড্ডায় সময় কাটাত, যার বেশিরভাগই ছিল অর্থহীন। কিন্তু রাজুর এই উদ্যোগে এলাকায় শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা এবং বয়স্ক পাঠকরাও এখন এখানে এসে বই পড়ছেন। কেউ চাইলে এখান থেকে বই বাসায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন। রাজু নিজে অক্ষরজ্ঞানহীন থাকলেও বইয়ের প্রতি তার এই গভীর টান এবং অন্যদের বইমুখী করার প্রচেষ্টা সমাজের অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিজের দোকানকে লাইব্রেরি বানানোর পেছনে রাজুর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই ঠিকই, কিন্তু আছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি। তিনি জানান, তাকে দেওয়া সেই অপমানের কথা তিনি এখনো ভোলেননি, তবে সেই অপমানই তাকে আজ মানুষের কাছে সম্মান এনে দিয়েছে। তিনি চেয়েছিলেন এমন কিছু করতে যা অন্যদের জীবনে উপকারে আসে। আজ রাজুর কাছে বই শুধু পড়ার উপকরণ নয়, বরং সেটি তার ব্যক্তিত্বের নতুন পরিচয়। সেলুনে আসা মানুষদের তিনি নিয়মিত পড়াশোনার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন, যা অনেকের ভাবনা বদলে দিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজুর এই লাইব্রেরির গল্প ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। বইয়ের গুরুত্ব যে কত বড়, তা যেন রাজু হাতে-কলমে শিখিয়ে দিচ্ছেন। তার এই ছোট্ট সেলুনটি এখন কেবল চুল কাটার জায়গা নয়, বরং এলাকার জ্ঞানপিপাসু মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। যারা তাকে অশিক্ষিত বলে তুচ্ছ করেছিলেন, তারা আজ রাজুর এই উদ্যোগ দেখে অবাক। রাজু প্রমাণ করেছেন যে, শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনে নয়, বরং জানার আগ্রহ ও সৃজনশীল কাজের মধ্যেও রয়েছে। তার এই সাহসী পথচলা সমাজের জন্য এক বড় বার্তা নিয়ে এসেছে, যেখানে ঘৃণা ও অপমানের বদলে মানুষ মেধার জয়গান গাইছে।
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]