উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার যৌক্তিকতা ও বাস্তবতা
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো বরাবরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসার প্রথম ভরসার জায়গা হলো এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে বাড়িয়ে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা ও তার যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের মতে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এবং জটিল রোগের প্রকোপ সামলাতে এই উদ্যোগ অপরিহার্য হলেও কেবল শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো কয়েক দশক আগে যে অবকাঠামো নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, বর্তমান সময়ে দেশের জনসংখ্যা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে তা অনেকটাই অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। গ্রামে এখন অসংক্রামক ব্যাধি বা লাইফস্টাইল ডিজিজের প্রবণতা বাড়ছে। ফলে, স্থানীয় পর্যায়ে উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি এখন সময়ের দাবি। শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হলে স্বাভাবিকভাবেই ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়বে এবং স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে জেলা বা বিভাগীয় শহরে রোগীর চাপ অনেকাংশে কমে আসবে, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে শয্যা বাড়ানোর উদ্যোগটি তখনই সফল হবে যখন এর সাথে তাল মিলিয়ে অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধারও উন্নয়ন ঘটবে। অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, শুধুমাত্র শয্যা বাড়ালে হাসপাতালের পরিসর বাড়বে ঠিকই, কিন্তু যদি চিকিৎসক, নার্স এবং টেকনিশিয়ানদের মতো দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া না হয়, তবে সেই শয্যাগুলো খালি পড়ে থাকবে অথবা চিকিৎসার মানের অবনতি ঘটবে। বর্তমানে অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই পর্যাপ্ত শল্যচিকিৎসক বা অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে। ১৫১ শয্যার একটি হাসপাতাল চালাতে যে পরিমাণ লজিস্টিক সাপোর্ট এবং ওষুধের জোগান প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও বাজেটের সমন্বয় জরুরি।
এক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো রক্ষণাবেক্ষণ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামো তৈরি করার পর তা দীর্ঘকাল ধরে টেকসই রাখা বা নিয়মিত সংস্কারের অভাবে অনেক স্থাপনা অল্প দিনেই জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি এই স্থাপনাগুলো কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে এবং যন্ত্রপাতি সচল রাখা হবে, সেই নীতিমালাও স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। এছাড়া, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের পর তা পরিচালনার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক উন্নয়নের দিকে না তাকিয়ে সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে যদি মানসম্মত ল্যাবরেটরি সুবিধা, জরুরি বিভাগ এবং সার্বক্ষণিক জরুরি অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তবেই সাধারণ মানুষ আস্থা ফিরে পাবে। রেফারেল সিস্টেম বা রোগী স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি যদি স্বচ্ছ ও কার্যকর হয়, তবেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগটি সার্থক হবে।
পরিশেষে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি সাহসী পদক্ষেপ। তবে দীর্ঘমেয়াদী সুফল পেতে হলে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও দক্ষ জনবলের নিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রাপ্যতা এবং নিরবচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। স্বাস্থ্যসেবাকে তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং সমন্বিত পরিকল্পনাই হবে মূল চাবিকাঠি। সূত্র: https://www.prothomalo.com/opinion/column/wk85pofkb2




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]