অজু ছাড়া মোবাইল ফোনে কোরআন পাঠের বিধান কী
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত এখন অনেক সহজতর হয়েছে। মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনেই এখন কোরআনের অ্যাপস ব্যবহার করে যেকোনো সময় তিলাওয়াত করা সম্ভব। তবে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে কোরআন পাঠের ক্ষেত্রে কিছু শরিয়াহগত বিষয় অনেকেরই অস্পষ্ট থাকে। বিশেষ করে অজু ছাড়া মোবাইল ফোনে কোরআন স্পর্শ করা বা পাঠ করার বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে। শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল বা ডিজিটাল ডিভাইসে কোরআন পাঠের বিষয়টি সাধারণ মুদ্রিত কোরআন শরীফ বা মাসহাফের সাথে তুলনামূলকভাবে ভিন্ন।
ইসলামি ফিকহ শাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী, পবিত্র কোরআন স্পর্শ করার জন্য অজু থাকা আবশ্যক। কোরআনুল কারিমের প্রতি যথাযথ আদব ও সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই এই বিধান নির্ধারিত হয়েছে। তবে ডিজিটাল ডিভাইসের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করা হয়। বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, স্মার্টফোনের স্ক্রিন বা টাচ ডিসপ্লে মূলত কোরআনের আয়াতের সরাসরি ওপরের অংশ নয়। যখন আমরা ফোনে কোরআন অ্যাপ ব্যবহার করি, তখন যে অক্ষরগুলো আমরা দেখি, তা মূলত একটি কাঁচের পর্দার নিচে ইলেকট্রনিক সিগন্যালের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়। এই কাঁচ বা গ্লাস একটি স্বতন্ত্র আবরণ হিসেবে কাজ করে, যা আয়াতের হরফের সাথে সরাসরি স্পর্শ হওয়ার বিষয়টি বাধাগ্রস্ত করে। অর্থাৎ, আপনি যখন ফোনটি ধরছেন বা স্ক্রিনে স্পর্শ করছেন, তখন আপনি সরাসরি পবিত্র হরফগুলো স্পর্শ করছেন না, বরং ফোনের ওপরের কাঁচের আবরণটি স্পর্শ করছেন। এই প্রযুক্তিগত পার্থক্যের কারণে আলেমদের একাংশ মনে করেন যে, এটি সরাসরি কোরআন স্পর্শ করার হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়।
তবে এই ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। যদিও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে, কিন্তু কোরআনের সম্মান রক্ষা করা মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। অনেক আলেম পরামর্শ দেন যে, মোবাইল ফোনে কোরআন পাঠের সময়ও অজুসহ পবিত্র অবস্থায় থাকা উত্তম এবং এটি অধিকতর আদবপূর্ণ। কারণ, কোরআন কেবল একটি পাঠ্য বিষয় নয়, বরং এটি আল্লাহর কালাম, যার সাথে গভীর ভক্তি ও সম্মান জড়িয়ে আছে। তাই সম্ভব হলে অজুসহ পাঠ করা উচিত। তবে বিশেষ প্রয়োজনে বা কোনো অপারগতার ক্ষেত্রে অজু ছাড়া ফোন থেকে কোরআন পাঠ করলে তা সরাসরি পবিত্র কোরআন শরীফ স্পর্শের গুনাহের পর্যায়ে পড়বে না বলে অনেক ফকিহ মত দিয়েছেন।
অন্যদিকে, শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে কিছুটা সহজভাবে দেখা হয়। শিক্ষার খাতিরে বা অভ্যাসের শুরুতে শিশুদের কুরআন স্পর্শের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ না করার নজিরও ফিকহ শাস্ত্রে পাওয়া যায়। তবে বয়স্কদের ক্ষেত্রে কোরআনের মর্যাদা সমুন্নত রাখা একান্ত কর্তব্য। ডিজিটাল ডিভাইসে কোরআন পড়ার সময় স্ক্রিনে থাকা পবিত্র আয়াতগুলো যেন অবজ্ঞার পাত্র না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। অনেকেই অসতর্কতাবশত কোরআন অ্যাপ খোলা থাকা অবস্থায় ফোনটি যেকোনো স্থানে ফেলে রাখেন বা অনুপযুক্ত স্থানে রাখেন, যা অত্যন্ত অনুচিত। মোবাইল বা ট্যাব ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই আদব বজায় রাখা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব। সবশেষে বলা যায়, প্রযুক্তি আমাদের ইবাদতকে সহজতর করেছে ঠিকই, কিন্তু কোরআনের পবিত্রতা রক্ষার মূল চেতনা যেন আমাদের কাজে ও আচরণে ফুটে ওঠে। ডিজিটাল যুগে কোরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক যেন আরও সুদৃঢ় ও সম্মানজনক হয়, সেটাই প্রত্যাশিত।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]