লিপ সেকেন্ড থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছে বিশ্ব: ২০২৭ সালে কার্যকর হবে নতুন সময় গণনা
সময়ের সূক্ষ্ম হিসাব নিয়ে গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা বিতর্ক ও আলোচনার ইতি টানতে যাচ্ছে বিশ্ব। ঘড়ির কাঁটায় সময় সমন্বয় করার জন্য যে লিপ সেকেন্ডের ধারণাটি প্রচলিত ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আগামী ২০২৭ সালের পর থেকে আর লিপ সেকেন্ডের প্রয়োজন হবে না এবং এই পদ্ধতি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে। ইন্টারন্যাশন্যাল ব্যুরো অফ ওয়েটস অ্যান্ড মেজারমেন্টস-এর সাম্প্রতিক এই ঘোষণা বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি ও যোগাযোগ খাতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লিপ সেকেন্ড মূলত পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির সঙ্গে পারমাণবিক ঘড়ির সময়ের সামঞ্জস্য বজায় রাখার একটি প্রক্রিয়া ছিল। পৃথিবী তার অক্ষে সবসময় সমান গতিতে ঘোরে না। কখনও এর ঘূর্ণন গতি সামান্য ধীর হয়ে যায়, আবার কখনও গতি বাড়ে। পৃথিবীর ঘূর্ণন ও পারমাণবিক ঘড়ির এই পার্থক্যের কারণে সময়ের হিসাবে গরমিল দেখা দেয়। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য দূর করতে ১৯৭২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৩২ বার বৈশ্বিক সময়ের সঙ্গে অতিরিক্ত এক সেকেন্ড যোগ করা হয়েছে। এই অতিরিক্ত এক সেকেন্ডটিই পরিচিত ‘লিপ সেকেন্ড’ নামে। তবে এই সামান্য মনে হওয়া এক সেকেন্ড প্রযুক্তি বিশ্বে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে সক্ষম।
বর্তমান যুগে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, জিপিএস সিস্টেম, আধুনিক ব্যাংকিং লেনদেন এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিটি খুঁটিনাটি ডিজিটাল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। এই নেটওয়ার্কগুলো অত্যন্ত নিখুঁত পারমাণবিক ঘড়ির সময়ের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। লিপ সেকেন্ড যখন যোগ করা হয়, তখন বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল অবকাঠামোতে এক ধরনের অস্থিরতা বা ট্রাফিক জ্যামের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। যদিও সাধারণ ব্যবহারকারী হিসেবে আমরা এটি টেরই পাই না, কিন্তু সফটওয়্যার সিস্টেমের জন্য এই বিরতি বা বাড়তি সেকেন্ড বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কখনো কখনো এই প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও থাকে, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড’ বা নেতিবাচক লিপ সেকেন্ডের ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণার সারমর্ম হলো, বর্তমান প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের যুগে এভাবে বারবার সময়ের সঙ্গে হেরফের করা আর নিরাপদ নয়। প্রযুক্তির এই জটিল নেটওয়ার্ককে নির্বিঘ্ন রাখতে লিপ সেকেন্ডের মতো অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা বাদ দেওয়া এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। ২০২৭ সালের মে মাসের পর থেকে এই নিয়মটি আর কার্যকর থাকবে না। অর্থাৎ তখন থেকে ঘড়ির কাঁটা আর নতুন করে লিপ সেকেন্ডের কারণে বাধাগ্রস্ত হবে না বা নতুন কোনো সেকেন্ড যুক্ত হবে না।
এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। জিপিএস ন্যাভিগেশন, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল এবং ডিজিটাল লেনদেনের সার্ভারগুলো এখন অনেক বেশি স্থিতিশীল থাকবে। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে যে সামান্য সময়ের বিচ্যুতি ঘটবে, তা প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে সামঞ্জস্য করার পরিকল্পনা রয়েছে বিজ্ঞানীদের। অর্থাৎ মানবসভ্যতা এমন এক যুগে প্রবেশ করছে যেখানে সময়ের হিসাব হবে আরও বেশি ডিজিটাল ও গাণিতিক, যেখানে প্রথাগত ঘড়ির সঙ্গে পৃথিবীর ঘূর্ণনের সামান্য অমিল আর প্রযুক্তির পথ রোধ করবে না। লিপ সেকেন্ডের বিদায় নিশ্চিতভাবেই বিশ্বকে একটি মসৃণ ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সময়ের দিকে এগিয়ে নেবে।





আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]