শেরপুরের গারো পাহাড়ে হাজারো পুণ্যার্থীর মোমবাতি প্রজ্জ্বলেনে অনন্য ধর্মীয় উৎসব
শেরপুরের গারো পাহাড়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও অগণিত পুণ্যার্থীর মোমবাতির আলোয় এক অনন্য দৃশ্য তৈরি হয়েছে। মা মারিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা ও আশীর্বাদ কামনায় প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ আলোক শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন।
শেরপুরের গারো পাহাড়ের শান্ত ও নিরিবিলি প্রকৃতি গত কয়েক দিন ধরে এক অন্যরকম আমেজ ধারণ করেছে। হাজারো পুণ্যার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং মোমবাতির স্নিগ্ধ আলোয় পাহাড়ের বুক আজ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের এই বড় ধর্মীয় উৎসবে যোগ দিতে দেশ-বিদেশ থেকে সমবেত হয়েছেন অগণিত মানুষ। তারা প্রত্যেকেই এক অমোঘ আকর্ষণে ছুটে এসেছেন ‘মা মারিয়া’র প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এবং তার আশীর্বাদ লাভের আশায়। ধর্মীয় বিশ্বাসের গভীরতায় তারা পাহাড়ি অরণ্যের পথ পাড়ি দিয়ে অংশ নিয়েছেন এই বিশেষ আয়োজনে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, এই আলোক শোভাযাত্রা ও প্রার্থনা সভায় প্রায় অর্ধলক্ষাধিক পুণ্যার্থীর উপস্থিতি দেখা গেছে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ও বন্ধুর প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা সমবেত হয়েছেন নির্দিষ্ট গন্তব্যে। প্রত্যেকের হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি যেন আঁধার রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে এক পবিত্র আলোর দিশা দেখাচ্ছে। পাহাড়ি জনপদ, বনজঙ্গল এবং উপত্যকায় মোমবাতির আলো ছড়িয়ে পড়ে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। এমন দৃশ্য কেবল স্থানীয় বাসিন্দাদের নয়, পর্যটক ও বাইরের দর্শনার্থীদের জন্যও অত্যন্ত আবেগময় এক মুহূর্ত।
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতি বছরের মতো এবারও মা মারিয়ার প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে এই বিশেষ আলোক শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। মানুষের মনের আকুতি, প্রার্থনা এবং শান্তি কামনাই ছিল এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। পাহাড়ি এলাকায় শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে ধর্মপ্রাণ মানুষের এই সম্মিলন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও পাহাড়ি এলাকা এবং চলাচলের পথ অনেকটা দুর্গম, তবুও ভক্তদের উদ্দীপনায় কোনো ঘাটতি ছিল না। সব কষ্ট ভুলে তারা মোমবাতি হাতে সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে গেছেন ধর্মীয় গান ও প্রার্থনার সুরের মূর্ছনায়।
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগমে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য পুলিশের টহল এবং স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং সুন্দরভাবে আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়ায় পুণ্যার্থীরা নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় আচার পালন করতে পেরেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে আসা পুণ্যার্থীরাও এই আয়োজনে যুক্ত হয়ে সৌহার্দ্যের এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
শেরপুরের গারো পাহাড় বরাবরই তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। তবে এমন ধর্মীয় উৎসবের দিনে এই পাহাড় যেন নতুন করে তার আধ্যাত্মিক পরিচয় তুলে ধরে। প্রতিটি মোমবাতির আলো যেন একেকটি বিশ্বাসের প্রতীক। হাজারো মোমবাতির শিখা যখন একসাথে জ্বলে ওঠে, তখন মনে হয় পুরো পাহাড় যেন আলোর গালিচায় ঢাকা পড়েছে। মা মারিয়ার সান্নিধ্য পাওয়ার এই প্রবল আকাঙ্ক্ষা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মনে এক ধরনের প্রশান্তি ও ঐক্যের সুর জাগিয়ে তোলে। এই আলোক প্রজ্জ্বলেন কেবল একটি ধর্মীয় রীতি নয়, বরং এটি মানুষের অদম্য বিশ্বাস ও ভক্তির বহিঃপ্রকাশ। উৎসব শেষে পুণ্যার্থীরা মনের শান্তি নিয়ে নিজেদের গন্তব্যে ফিরে যেতে শুরু করলেও, গারো পাহাড়ের এই স্মৃতি এবং আলোকজ্জ্বল দৃশ্য সবার হৃদয়ে দীর্ঘদিন গেঁথে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]