বুদ্ধিজীবীদের দলবদলের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পণ হিসেবে যাঁদের কাজ করার কথা, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাঁদের অনেকের কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের সংশয় তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের একাংশের যে দ্রুত মতাদর্শ পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যায়, তা রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের এক কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন যেদিকে হেলে পড়ে, বুদ্ধিজীবীদের একটি নির্দিষ্ট অংশ সেদিকেই তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলেন। এই প্রবণতাকে অনেকেই বসন্তের কোকিলের আগমনের সঙ্গে তুলনা করেন, তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় একে আরো গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতা বদলের সাথে সাথে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীর এই সুবিধাবাদী অবস্থানের কারণে অনেক সময় প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়। তাঁদের এই আচরণকে অনেকে গিরগিটির মতো রং পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করছেন। যেকোনো রাজনৈতিক আবহাওয়া ও পতাকার রঙের সাথে মিল রেখে নিজেদের অবস্থান দ্রুত বদলে ফেলার এই কৌশল মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থসিদ্ধির অংশ বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, অতীতের অনেক বুদ্ধিজীবী যারা এক সময় এক দলের গুণকীর্তনে ব্যস্ত ছিলেন, ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে তারাই আবার নতুন ধারার সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। এই ধারাবাহিক পরিবর্তন জনমনে এক ধরনের হতাশা তৈরি করে, কারণ বুদ্ধিজীবীরা সমাজের পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচিত হন।
বুদ্ধিজীবীদের এই দলবদলের প্রবণতা নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি অধিকতর দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তথাকথিত এই বুদ্ধিজীবীরা যখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রাজনীতির মাঠ গরম রাখেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে বুদ্ধিবৃত্তিক সততা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে যাদের বলিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ কণ্ঠস্বর শোনা প্রত্যাশিত, সেখানে ক্ষমতার সাথে আপস করার এই সংস্কৃতির ফলে সমাজের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হচ্ছে। বুদ্ধির লড়াই বা যুক্তির চর্চার চেয়েও যখন ব্যক্তিগত সুবিধা বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন সেটি আর বুদ্ধিবৃত্তি থাকে না, বরং তা রাজনীতিরই একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রকৃত বুদ্ধিজীবী তারাই, যারা ক্ষমতার পরিবর্তনের তোয়াক্কা না করে সত্যের পথে অবিচল থাকেন এবং সমাজের অসংগতিগুলো সাহসের সাথে তুলে ধরেন। অথচ বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ কেবল নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য রাজনীতির ডালপালা বা বাতাসের গতিপথ অনুসরণ করে চলছেন। এই সংকীর্ণ মানসিকতা দেশের সুস্থ রাজনৈতিক চর্চাকে ব্যাহত করছে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই প্রবণতা সমাজকে দ্বিধাবিভক্ত করে এবং বুদ্ধিজীবী শ্রেণির গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। তাই সময়ের প্রয়োজনে বুদ্ধিজীবীদের এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় জনস্বার্থে ও সত্যের পথে নিজেদের অবস্থান সুনিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সামগ্রিকভাবে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সুস্থতার জন্য বুদ্ধিজীবীদের এই নিরপেক্ষ অবস্থান ও নৈতিক দৃঢ়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]