হারানো সহকর্মীদের স্মৃতিচারণায় আবেগাপ্লুত তারকা
চলচ্চিত্রের রঙিন দুনিয়ায় ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যে মানুষগুলো দর্শককে হাসিয়েছেন কিংবা কাঁদিয়েছেন, সময়ের ব্যবধানে তাদের অনেকেই আজ আমাদের মাঝে নেই। এক সময়ের ব্যস্ত কর্মময় জীবন, লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের ঝনঝনানি আর সহকর্মীদের সাথে খুনসুটির দিনগুলো হঠাৎ করেই যেন অনেকটা থমকে দাঁড়ায় যখন পুরনো কোনো স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। প্রিয় সহকর্মীদের হারানোর বেদনা এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে, যা সময়ের সাথে সাথে কেবল বাড়তেই থাকে। এমনই এক আবেগঘন মুহূর্তে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসলেন বর্তমান প্রজন্মের এক শিল্পী, যেখানে বারবার ঘুরে ফিরে আসছিল প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনয়শিল্পীদের কথা।
কথায় কথায় উঠে এল এটিএম শামসুজ্জামানের মতো দাপুটে অভিনেতার কথা। মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের এই কালজয়ী শিল্পী কেবল সহকর্মী ছিলেন না, ছিলেন অভিনয়ের এক জীবন্ত পাঠশালা। শুটিং সেটে তার উপস্থিতি মানেই ছিল শেখার এক দারুণ সুযোগ। সেই মানুষটি আজ নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া অভিনয়ের ছাপ এখনো প্রতিটি শটে জীবন্ত হয়ে ওঠে। একইসাথে উঠে এল পারভিন সুলতানা দিতি, যিনি তার সাবলীল অভিনয় আর অমায়িক ব্যবহারের জন্য সবার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তার অকাল প্রস্থান বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবেই রয়ে গেছে। সায়েমাসহ আরও যারা কাজ করতে করতে আজ ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের স্মৃতিই আজ এক মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে রেখেছে বেঁচে থাকা শিল্পীদের।
কাজের ফাঁকে আড্ডার ছলে যখন পুরনো দিনের শুটিংয়ের গল্প হয়, তখন মনে হয় যেন এই তো সেদিন তারা ছিলেন। ক্যামেরা সেটে মেকআপ নিতে নিতে কতশত হাসি-ঠাট্টা, দুপুরের খাবার শেয়ার করা কিংবা স্ক্রিপ্ট নিয়ে তুমুল আলোচনা—সবই যেন চোখের পলকের ঘটনা। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন দেয়াল যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন উপলব্ধি হয় পৃথিবীটা কত দ্রুত বদলে যায়। যেসব মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা হয়েছে, তারা আজ শুধুই স্মৃতি। এই শূন্যতা কি কখনো পূরণ হওয়ার মতো? প্রশ্ন জাগে, শিল্পের টানে মানুষ কত আপন হয়ে ওঠে, আবার সময়ের নিয়মে তারাই কত দূরে সরে যায়।
প্রয়াত শিল্পীদের সেই কাজগুলো এখন টেলিভিশন বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে যখন দেখা যায়, তখন মনে হয় তারা যেন এখনো আমাদের আশেপাশেই আছেন। তাদের রেখে যাওয়া সৃষ্টিগুলোই তাদের অমর করে রেখেছে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা তাদের কাছ থেকে শিখেছেন, অনুপ্রাণিত হয়েছেন। সেই শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা নিয়েই এগিয়ে চলা। আজ যখনই কোনো শুটিং ফ্লোরে পা রাখা হয়, অবচেতনভাবেই পুরনো সেই চেনা মুখগুলো খুঁজে ফেরে মন। ক্যামেরা অন হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তের সেই নীরবতায় প্রিয় মানুষগুলোর উপস্থিতি যেন আজও অনুভব করা যায়।
একজন শিল্পীর জন্য তার সহকর্মীদের হারানো মানে নিজের জীবনের একটি অংশ হারিয়ে ফেলা। কারণ, শুটিং ফ্লোরের দীর্ঘ সময়গুলোয় সহকর্মীরাই হয়ে ওঠেন দ্বিতীয় পরিবার। সেই পরিবারের সদস্য কমে যাওয়া মানে নিজের একান্ত ভুবনে একাকী হয়ে পড়া। তবে মৃত্যুর অমোঘ নিয়মে যারা চলে গেছেন, তাদের প্রতি সম্মান জানিয়েই বর্তমানের শিল্পীরা কাজ করে যাচ্ছেন। তারা মনে করেন, প্রিয় সহকর্মীদের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হবে তাদের প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি। স্মৃতির পাতা থেকে হারিয়ে না যাওয়া এই মানুষগুলো চিরকাল আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এবং দর্শকদের হৃদয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন। তাদের শূন্যতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু শিল্প অমর।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]