ঘূর্ণিঝড় অর্ণব: দুর্যোগের নামকরণ হয় যেভাবে
সম্প্রতি ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম ঘোষণার পর থেকেই জনমনে একটি সাধারণ কৌতূহল তৈরি হয়েছে—কেন ঘূর্ণিঝড়ের এমন অদ্ভুত সব নাম রাখা হয় এবং এই নামকরণের পেছনের কারিগরই বা কারা? সাধারণত ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম কোনো ব্যক্তি বা দেশের খামখেয়ালিতে রাখা হয় না। বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা ও সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলি। মূলত দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা, আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রদান ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার সুবিধার্থেই এসব ঘূর্ণিঝড়ের একটি আলাদা পরিচয় বা নাম দেওয়া হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের নাম রাখার জন্য আঞ্চলিক সংস্থা রয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমও এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক আবহাওয়া কেন্দ্রগুলো সম্মিলিতভাবে এই তালিকার ব্যবস্থাপনা করে থাকে। এই তালিকার লক্ষ্য হলো কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় আঘাত হানা প্রতিটি দুর্যোগকে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করা। কারণ একই সময়ে মহাসাগরে একাধিক ঘূর্ণিঝড় সক্রিয় থাকতে পারে। নাম না থাকলে সাধারণ মানুষের কাছে সতর্কতা বার্তা পৌঁছে দেওয়া বা প্রশাসনিক উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনা করা বেশ জটিল হয়ে পড়ে। এছাড়া বিভ্রান্তি এড়াতেও নামকরণের এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত কার্যকর।
নামকরণের প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ এবং সুশৃঙ্খল। সাধারণত যে দেশগুলো সংশ্লিষ্ট ঘূর্ণিঝড় প্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত, তারা নিজেরাই নিজেদের প্রস্তাবিত নামগুলো বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার কাছে জমা দেয়। নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের জন্য বেশ কয়েকটি দেশের সমন্বয়ে এই তালিকা তৈরি করা হয়। যেমন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ মিলে একটি তালিকা প্রণয়ন করে। এই দেশগুলো পর্যায়ক্রমে একটির পর একটি নাম ব্যবহার করে। একবার কোনো একটি ঘূর্ণিঝড়ের জন্য কোনো নাম ব্যবহার হয়ে গেলে, সেই নামটি তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায় এবং ভবিষ্যতে আর ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। এভাবে বছরের পর বছর ধরে এই তালিকার ক্রম অনুসারে নাম নির্বাচন করা হয়।
ঘূর্ণিঝড়ের নামের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। নামগুলো এমন হতে হয় যেন তা কোনো ধর্ম, বর্ণ, গোত্র বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর অনুভূতিতে আঘাত না করে। এছাড়া কোনো নামের মাধ্যমে কাউকে অপমান করা বা রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দেওয়া যাবে না। নামকরণ হতে হবে সহজ, শ্রুতিমধুর এবং উচ্চরণযোগ্য। অনেক সময় বিপর্যয়ের ভয়াবহতার কথা মাথায় রেখে নামগুলো কিছুটা সংক্ষিপ্ত রাখার চেষ্টা করা হয়। নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য বা আঞ্চলিক পরিচিতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্যানেল তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখে।
অর্ণব নামটি যে প্রেক্ষাপটে এসেছে, তা নির্দেশ করে যে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পূর্বাভাস দেওয়া সংস্থাগুলো তাদের পূর্বনির্ধারিত তালিকা থেকেই এটি বেছে নিয়েছে। অর্ণব মানে সমুদ্র, যা ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃতির সাথেও বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতীতে অনেক বড় বড় ঘূর্ণিঝড়ের নাম নিয়ে যেমন আতঙ্ক কাজ করেছে, তেমনি এই নামকরণের ফলে দুর্যোগের তীব্রতা ও অবস্থান সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যম সহজেই একে অপরকে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভীতি বা উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু এই নামগুলো কেবল দুর্যোগ চিহ্নিত করার উপায় মাত্র, কোনো অশুভ সংকেত নয়। বরং বিজ্ঞানসম্মতভাবে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের এই প্রক্রিয়াটি দুর্যোগকালীন ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। সঠিক সময়ে সতর্কতা সংকেত প্রচার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজতর হয়েছে। নামকরণের এই আন্তর্জাতিক পদ্ধতিটি সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]