বাংলাদেশকে অভিবাসন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে: স্পীকার
জাতির সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার অংকের নিরিখে তাদের মূল্যায়ন করলে ভুল হবে। প্রবাসীরা আমাদের দেশের গর্ব এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স কেবল সংখ্যা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে দেশের সাধারণ মানুষের স্বপ্ন, কষ্ট এবং অমানবিক লড়াই। বুধবার রাজধানীর অভিজাত হোটেল ওয়েস্টিনে ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত অভিবাসন, অধিকার ও উন্নয়ন বিষয়ক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম এমন মন্তব্যই করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, আমাদের বাংলাদেশকে কেবল একটি অভিবাসন প্রেরণকারী দেশ হিসেবে রাখলে চলবে না, বরং একে একটি উন্নত অভিবাসন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
স্পীকার বলেন, বিদেশে যারা কাজ করছেন, তারা আমাদের দেশের প্রতিনিধি। তাদের অধিকার, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে রাষ্ট্র যতটা গর্ববোধ করে, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষায় ঠিক ততটাই উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। অভিবাসন মানেই শুধু বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জন নয়, এর সাথে জড়িত আছে হাজার হাজার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা। তিনি আরও বলেন, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে যারা বিদেশে কাজ করতে যান, তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং ভাষাগত দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। দক্ষ প্রবাসী শ্রমিকেরা বিদেশে অধিকতর ভালো বেতনে কাজ করার সুযোগ পান, যা সরাসরি আমাদের অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অভিবাসন খাত অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক মন্দা বা ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমাদের প্রবাসীরা অনেক সময় বিপদে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক ও আইনি সহায়তা জোরদার করা প্রয়োজন। শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠনগুলো যেভাবে অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। স্পীকার জোর দিয়ে বলেন, আমাদের লক্ষ্য হতে হবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন প্রবাসী শ্রমিক নিজের দেশ নিয়ে গর্ব করতে পারেন। বিদেশে তাদের মর্যাদা যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাই বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে যাবেন, তারা যেন সম্মানের সাথে কাজ করেন। তাদের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক মূল্যায়ন এবং সুরক্ষার জন্য কঠোর নীতিমালা তৈরি করতে হবে। দেশের ভেতর দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বিদেশে শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আমাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অভিবাসন কেবল আর্থিক লেনদেন নয়, এটি একটি মানবিক ইস্যু। পরিশেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করতে হলে প্রবাসীদের অবদানের স্বীকৃতি দিতে হবে এবং অভিবাসন খাতকে আরও সুশৃঙ্খল ও আধুনিক করে গড়ে তুলতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সচেতন নাগরিক সমাজকেও প্রবাসীদের কল্যাণে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সেমিনারে বিভিন্ন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, গবেষক এবং অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। সকলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কীভাবে একটি নিরাপদ, নিয়মিত ও দায়িত্বশীল অভিবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, যা দেশের টেকসই উন্নয়নের সহায়ক হবে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]