শীতলক্ষ্যার পাড়ে রাতের বেলা ডাঙায় উঠে আসা রহস্যময় মাছের সন্ধানে
শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ঘেঁষা জনপদগুলোতে একসময় প্রচলিত ছিল এক অদ্ভুত প্রাণীর গল্প। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি বাহোক, বাসুকি কিংবা ক্ষীরাবাইম নামে পরিচিত। দেখতে অনেকটা সাপের মতো হলেও আসলে এটি একটি মাছ। গভীর রাতে নদী থেকে ডাঙায় উঠে এসে ফসলের খেতে হানা দেওয়ার স্বভাবের কারণে এলাকাভেদে এর নামকরণ করা হয়েছে ভিন্নভাবে। বিশেষ করে নদীর তীরবর্তী ক্ষীরাখেতগুলোতে গভীর রাতে এই মাছের উপস্থিতি ও বিচরণ নিয়ে স্থানীয় প্রবীণদের মুখে এখনো নানা রোমহর্ষক ও লোকজ গল্প শোনা যায়।
চরসিন্দুরের চরের কৃষকদের কাছে এই মাছ ছিল এক আতঙ্কের নাম। মৌসুমের সময় যখন ক্ষীরার ফলন ভালো হয়, তখন অনেক কৃষকই রাত জেগে খেত পাহারা দিতেন। কারণ, তারা জানতেন, রাতের নিস্তব্ধতায় শীতলক্ষ্যা থেকে উঠে আসবে এক বিশেষ আগন্তুক। প্রায়ই দেখা যেত, ভোরে খেতে গিয়ে কৃষকরা দেখছেন তাদের কষ্টের ফসল নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এই অশুভ আগন্তুকের হাত থেকে ফসল রক্ষা করতে কৃষকরা অনেক সময় অভিনব সব কৌশলের আশ্রয় নিতেন। এমন একটি ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে একজন অভিজ্ঞ কৃষক রাত জেগে ওত পেতে থাকতেন এই রহস্যময় মাছটিকে ধরার জন্য।
সেই বিশেষ কৌশলের একটি উপায় ছিল ছাইয়ের ব্যবহার। মাছটি যখন নদী থেকে ডাঙায় উঠে খেতের দিকে যেত, তখন কৃষক নিশ্চিত হতেন তার গতিপথ। এরপর রাতের অন্ধকারে নদীর পাড় থেকে খেতের দিকে যাওয়ার পথে একটি নির্দিষ্ট স্থানে শুকনা ছাই ছড়িয়ে রাখা হতো। মাছটি যখন সেই ছাইয়ের ওপর দিয়ে যেত, তখন তার শরীর আঠালো হয়ে যেত এবং সে আর স্বাভাবিকভাবে চলতে পারত না। এভাবেই কৌশলী কৃষকরা সেই বিশেষ মাছটিকে কাবু করতেন। এমন এক অভিযানে প্রায় চার ফুট লম্বা ও সাত কেজি ওজনের একটি মাছ ধরার ঘটনাও স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত আছে।
শিকারি ও গবেষকদের মতে, এটি সাধারণ কোনো মাছ নয় বরং এর শারীরিক গঠন ও চলাফেরার ধরন একে অনন্য করে তুলেছে। সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলার ক্ষমতার কারণে অনেকেই একে ভুলবশত সাপ ভেবে ভুল করেন। তবে প্রকৃতপক্ষে এটি একটি জলজ প্রাণী যা ডাঙায় কিছুটা সময় টিকে থাকতে পারে। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, এই মাছের মাংসের স্বাদ নাকি অনেকটা খাসির মাংসের মতো, যার ফলে অতীতে অনেকেই একে শিকার করতে আগ্রহী ছিলেন।
তবে সময়ের সাথে সাথে এই মাছের বিচরণক্ষেত্র ও সংখ্যায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। শীতলক্ষ্যা নদীর বাস্তুসংস্থানের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই রহস্যময় মাছটির দেখাও এখন আর তেমন মেলে না। বর্তমানে এটি অনেকের কাছে কেবল একটি স্মৃতি বা লোককথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণবিদদের মতে, আমাদের নদীমাতৃক দেশে এমন অনেক জলজ প্রাণী রয়েছে যাদের জীবনধারা সম্পর্কে আমাদের জানা এখনো অসম্পূর্ণ। এই ক্ষীরাবাইম বা বাহোক মাছটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং এর প্রজাতি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক গবেষণার গুরুত্ব রয়েছে, যাতে আগামী প্রজন্মের কাছে এসব অদ্ভুত প্রাণীর তথ্য হারিয়ে না যায়। প্রকৃতির এই রহস্যময় সত্তাগুলো আমাদের নদী ও পরিবেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যাদের সুরক্ষা ও সঠিক পরিচর্যা জরুরি।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]