সন্ধ্যা নামলেই ছাতিমের সুবাস কেন ছড়ায় বাতাসে
শরৎ ও হেমন্তের সন্ধায় যখন প্রকৃতিতে হালকা হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করে, তখন পথ চলতে চলতে হঠাৎ করেই নাকে আসে এক ভারী ও মিষ্টি গন্ধ। রাস্তার মোড়ে কিংবা বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা ছাতিম গাছ থেকে ভেসে আসা এই সুবাস যেন জানান দেয় ঋতু পরিবর্তনের বার্তা। গাছটিকে প্রকৃতিপ্রেমীরা অনেকেই সপ্তপর্ণী নামে চেনে, যার বৈজ্ঞানিক নাম অ্যালস্টোনিয়া স্কলারিস। ছাতিম গাছ সাধারণত বেশ উঁচু হয় এবং এর ডালপালার বিন্যাস অনেকটা ছাতার শিকের মতো চারদিকে ছড়িয়ে থাকে। এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, একটি গিঁটে সাধারণত সাতটি পাতা থাকে, যা থেকেই মূলত সপ্তপর্ণী নামের উৎপত্তি হয়েছে। তবে এর ফুলগুলো কিন্তু খুবই সাদামাটা, আকারে ছোট এবং হালকা সবুজাভ-সাদা রঙের হয়ে থাকে। এত ছোট ফুল থেকে কীভাবে এত তীব্র ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ে অনেকের মনেই কৌতূহল কাজ করে।
বিজ্ঞানীদের মতে, ছাতিমের এই তীব্র গন্ধের উৎস হলো ফুলের পাপড়ির ওপরের স্তরের কোষে উৎপন্ন বিশেষ কিছু রাসায়নিক যৌগ। এই যৌগগুলো অত্যন্ত হালকা প্রকৃতির হওয়ায় খুব সহজেই বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে মিশে যেতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের উদ্বায়ী যৌগ বলা হয়। আমরা যখন এই গন্ধ পাই, তখন আসলে বাতাসে ভেসে থাকা এই বাষ্পীয় কণাগুলোই আমাদের ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে উদ্দীপ্ত করে। তবে ছাতিমের গন্ধ নিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতার ভিন্নতা রয়েছে। অনেকের কাছে এই সুবাস নেশা ধরানো বা মোহনীয়, আবার কারো কারো কাছে তা কিছুটা মাথা ধরানোও মনে হতে পারে। তবে এই তীব্রতাকে উপেক্ষা করা যে কঠিন, সে বিষয়ে অধিকাংশ মানুষই একমত পোষণ করেন।
ফুল থেকে বের হওয়া এই বিশেষ গন্ধের পেছনে একাধিক যৌগের সংমিশ্রণ কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণত ফুলের সুগন্ধে টারপিনয়েড নামক এক শ্রেণির যৌগ থাকে, যা অনেকটা ল্যাভেন্ডার বা লেবুর ঘ্রাণের মতো। এছাড়া বেনজেনয়েড নামক আরেকটি শ্রেণির যৌগের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে, যা গাছ তার অভ্যন্তরে থাকা ফিনাইলঅ্যালানিন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে তৈরি করে থাকে। তবে কোনো নির্দিষ্ট একটি যৌগই যে ছাতিমের গন্ধের জন্য দায়ী, তা বলা সম্ভব নয়। বরং এটি কয়েক ডজন বিভিন্ন যৌগের সুনির্দিষ্ট ও জটিল এক অনুপাতের মিশ্রণ। রান্নায় যেমন বিভিন্ন মশলার সঠিক অনুপাতে স্বাদের পরিবর্তন ঘটে, ঠিক তেমনই ছাতিমের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন রাসায়নিকের ভারসাম্যই এর অনন্য ঘ্রাণ তৈরি করে। এই রাসায়নিক সংমিশ্রণটি নমুনা বা পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, যার ফলে সব ক্ষেত্রে এর গন্ধ পুরোপুরি একই রকম অনুভূত না-ও হতে পারে। মূলত পরিবেশের সাথে উদ্ভিদের এই বিবর্তন ও জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়াই প্রকৃতিতে ছাতিমের সুবাস ছড়িয়ে দেয়।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]