আইজিপির ক্রসফায়ার বিষয়ক মন্তব্য নিয়ে তোলপাড়, অপসারণের দাবি ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টির
সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির কর্তৃক ক্রসফায়ার বিষয়ক বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ক্রসফায়ার করতে পারেন—এমন বক্তব্যের পরই আইজিপির কঠোর সমালোচনা করছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ এবং মানবাধিকার কর্মীসহ রাজনৈতিক দলগুলো। এই রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আইজিপির অপসারণ ও পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি)।
পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন বক্তব্য আসা অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মনে করছেন সমালোচকরা। বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ারের মতো বিষয়ে আইজিপির এমন অবস্থানকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এনসিপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, যে ব্যক্তি বা কর্মকর্তা দেশের আইন ও সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে কথা বলেন, তার মতো একজন ব্যক্তির পুলিশের প্রধান হিসেবে বহাল থাকার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। তারা অবিলম্বে আইজিপির অপসারণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন এই ইস্যুতে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্বে থাকা একজন ব্যক্তির কাজ হলো বিচার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। অথচ সেখানে বসে তিনি যদি নিজেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গান বা এ ধরনের উস্কানিমূলক কথা বলেন, তবে তিনি তার পদে থাকার সব ধরনের নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলেছেন। এই ধরনের বক্তব্য কেবল বিতর্কই তৈরি করে না, বরং এটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়।
গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে আইজিপির এই মন্তব্য নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, রাষ্ট্রের উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিদের যেকোনো বক্তব্য অনেক বেশি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। সেখানে ক্রসফায়ারের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে আইজিপির এই বক্তব্য জনমনে ভীতি ও ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। এনসিপি ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন এবং সচেতন মহল মনে করছে, এ ধরণের কর্মকাণ্ড গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পথে বড় বাধা।
যদিও আইজিপির এই বক্তব্যের পর প্রশাসনিক পর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বড় ধরণের প্রতিক্রিয়া বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, তবে এনসিপির মতো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে সরাসরি অপসারণের দাবি ওঠায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার এই বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের এমন বিতর্কিত অবস্থান দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, ক্রসফায়ার ইস্যুতে আইজিপির দেওয়া বিতর্কিত মন্তব্যের রেশ এখন দেশজুড়ে। একদিকে মানবাধিকার কর্মীরা একে চরম অমানবিক বলে সমালোচনা করছেন, অন্যদিকে এনসিপির মতো দলগুলো সরাসরি পদত্যাগের দাবি তুলে সরকারকে চাপের মুখে ফেলেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি থেকে দেশ বেরিয়ে আসতে চায় কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন সাধারণ মানুষের মনেও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আইজিপির পরবর্তী পদক্ষেপ কিংবা সরকারের অবস্থান কী হয়, তা জানতে এখন অপেক্ষা করতে হবে।”




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]