শিকড় ভোলা কখনোই উচিত নয়
সাফল্যের শিখরে আরোহণ করার পরেও নিজেদের আদি সত্তা বা শেকড়কে ভুলে না যাওয়ার আহ্বান উঠে এসেছে বিভিন্ন মহলে। মানুষের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নিজের বেড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট ও আত্মপরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। যে অবস্থানেই মানুষ থাকুক না কেন, অতীতকে স্মরণ রাখা এবং মাটির সাথে সংযুক্ত থাকা একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তাকে প্রকাশ করে। এই দর্শন অনুযায়ী, শিকড় ভোলা কেবল নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা নয়, বরং নৈতিক অবস্থানের বিচ্যুতিও বটে।
বর্তমান সময়ে আমরা যখন দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এবং প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বজনীন হয়ে উঠছি, তখন অনেক সময় নিজের শিকড় বা গোড়াকে অবহেলা করার প্রবণতা দেখা যায়। তবে প্রকৃত উন্নয়ন ও মানসিক প্রশান্তি পেতে হলে শৈশব, পরিবার এবং নিজ সংস্কৃতির সাথে সংযোগ বজায় রাখা অপরিহার্য। একজন ব্যক্তি তার পরিবার, সমাজ এবং যে পরিবেশ থেকে উঠে এসেছেন, তা-ই তার আসল পরিচয় বহন করে। সাফল্যের মোহে বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার চাপে যারা নিজেদের উৎসকে ভুলে যান, তারা দীর্ঘমেয়াদে বিচ্ছিন্নতাবোধে ভুগতে পারেন। তাই শেকড়কে আঁকড়ে ধরে সামনের দিকে এগিয়ে চলাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মপরিচয়ের সংকট নিরসনে শেকড়ের সাথে নিবিড় সংযোগ অত্যন্ত কার্যকর। যারা নিজেদের ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং অতীতের কঠিন সংগ্রামের কথা স্মরণ রাখেন, তারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্যশীল ও স্থির থাকতে পারেন। জীবন চলার পথে নানা প্রতিকূলতা আসতে পারে, কিন্তু সেই সময়ে নিজের শিকড়ই মানুষকে আত্মবিশ্বাস ও সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়। নিজের মাটির গন্ধ, ভাষা এবং সংস্কৃতিকে ধারণ করেই মানুষ বড় হয়। এই বিষয়গুলোকে বিসর্জন দিলে দীর্ঘস্থায়ী কোনো অর্জন পাওয়া সম্ভব নয়।
পাশাপাশি, নতুন প্রজন্মের কাছে শেকড়ের গুরুত্ব তুলে ধরা বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং বিশ্বায়নের ফলে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তন আসছে, তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে যেন আমরা নিজস্বতা হারিয়ে না ফেলি, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। শিকড়কে অস্বীকার করা মানে হলো নিজের ভিত্তিভূমিকে দুর্বল করে ফেলা। তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনের উচিত মানুষকে তাদের শেকড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগী করে তোলা।
পরিশেষে, জীবনের সাফল্য বা ব্যর্থতা—যাই আসুক না কেন, শেকড়কে কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এটি একজন মানুষের মানবিকতা ও নৈতিকতার পরিচায়ক। মাটির সাথে সম্পর্ক রেখে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখাই হলো প্রকৃত জীবনের সার্থকতা। আমরা যারা বর্তমান সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছি, আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে যে অতীতের শ্রম ও স্মৃতি রয়েছে, তাকে শ্রদ্ধা জানানোই হবে আমাদের ভবিষ্যতের ভিত্তি। তাই শিকড়কে মনে রাখা এবং একে শ্রদ্ধার সাথে পালন করা আমাদের সবার দায়িত্ব।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]