আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হলে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনীতির যে সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বেশ সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, আমরা কি আসলে বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে সঠিক ও যথাযথ কৌশল অবলম্বন করতে পারছি? দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে আমাদের এই সক্ষমতা এখন বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার আগে শুধুমাত্র আমদানির পরিমাণ বা পণ্যের শুল্ক নিয়ে ভাবলে চলবে না। এর পেছনে থাকা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং শ্রমবাজারের চাহিদাকে বিবেচনায় নেওয়া অপরিহার্য। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, চুক্তি স্বাক্ষরের সময় যতটা তোড়জোড় থাকে, পরবর্তীতে তার সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়ি। আমাদের সক্ষমতার ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় আমাদের পিছিয়ে দেয়। বাণিজ্য চুক্তির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত রফতানি আয় বাড়ানো এবং বাজারের বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করা। তবে আমরা কি সেই লক্ষ্য পূরণে কার্যকর রোডম্যাপ অনুসরণ করতে পারছি?
দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ছে, ফলে নতুন নতুন বাজারের সন্ধান করা এখন সময়ের দাবি। তবে কেবল নতুন বাজারের সন্ধানে দৌড়ালেই হবে না, বরং যে বাজারে আমরা প্রবেশ করতে চাচ্ছি, সেই বাজারের মানদণ্ড ও চাহিদা পূরণের সক্ষমতা আমাদের রয়েছে কি না, তা আগে নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, চুক্তি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের মান বা সময়মতো শিপমেন্ট নিশ্চিত করতে না পারায় অনেক সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এই ঘাটতিগুলো দূর করতে সরকার ও ব্যবসায়িক মহলকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বাণিজ্য চুক্তির একটি বড় অংশ হলো পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা আদান-প্রদান। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা কী ধরনের দরকষাকষি করছি, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর আমাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। তখন সব ধরনের বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা থাকবে না। তাই এখন থেকেই প্রতিটি বাণিজ্য চুক্তিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিচার-বিশ্লেষণ করে সামনে আগাতে হবে। দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পণ্যের বৈচিত্র্য আনয়ন ছাড়া কেবল চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়।
পরিশেষে, বাণিজ্য চুক্তি মানেই কেবল স্বাক্ষরের অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। প্রতিটি চুক্তির কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজনে তাতে সংশোধন আনা জরুরি। আমাদের নীতিনির্ধারকদের উচিত কেবল স্বল্পমেয়াদী লাভের কথা না ভেবে, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের স্বার্থে বাণিজ্য কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করা। সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই ও প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে যদি আমরা প্রতিটি বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারি, তবেই বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থানে টিকে থাকতে পারবে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ । ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ