কুশিগাঙের শীর্ণ দশা—সিলেটের প্রাণবন্ত নদীর সংকট
সিলেট বিভাগের কুশিঘাট এলাকায় অবস্থিত কুশিগাঙ, একসময় উত্তর‑পূর্বের বাণিজ্যিক ও পরিবহন জালের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। জৈন্তাপুরের হরিপুর এলাকায় হাওর থেকে উৎপত্তি হয়ে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে সিলেট নগরের কুশিঘাটে সুরমা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। তবে আজকের দিনে এই নদী তীব্র অস্তিত্বসংকটে ভুগছে; দখল, অবৈধ ভরাট এবং অনিয়মিত শোষণের ফলে তার প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত হয়েছে।
বর্ষাকালে সামান্য পরিমাণে পানির প্রবাহ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে কুশিগাঙের বেশিরভাগ অংশ রূপান্তরিত হয়ে সরু নালায় পরিণত হয়। এই নালার তলায় জেলেদের নৌকা অলসভাবে ভাসে, আর কখনো কখনো দুই পাড় অতিক্রম করে শাকসবজির চাষের জন্য ব্যবহার করা হয়। নদীর পানির অভাবে মাছ ধরার নৌকা শূন্য হয়ে যায়, জালের গুটিয়ে তোলা দৃশ্যই এখন এই অঞ্চলের নতুন বাস্তবতা।
কুশিগাঙের শীর্ণ দশা কেবল পরিবেশগত নয়, সামাজিক-অর্থনৈতিক দিকেও প্রভাব ফেলছে। কৃষকরা সেচের জন্য নির্ভরশীল এই নদীর পানির অভাবে ফসলের ফলন হ্রাস পেয়েছে, ফলে আয়ের ঘাটতি বাড়ছে। তীরবর্তী এলাকায় হাঁসের দলপানি পানির সন্ধানে নেমে আসে, আর নৌকাগুলো শীর্ণ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় মানুষদের জন্য নদী পারাপার কঠিন হয়ে পড়েছে। বাঁশের সাঁকো ও অগভীর পানিতে মাছ শিকারের অপেক্ষায় থাকা ক্যানি বকদুইয়ের দৃশ্য এখন একধরনের দুঃখজনক স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি সিলেট নগরের কুশিঘাট এলাকা ঘুরে ছবি তোলা হয়েছে, যেখানে কুশিগাঙের বর্তমান অবস্থা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। পানির ঘাটতি, শুষ্ক তীর, এবং নৌকাগুলোর অবহেলিত অবস্থা—এই সবই নদীর শীর্ণ দশার প্রমাণ। স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ সংস্থা এখন এই সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলছে, তবে বাস্তবায়ন এখনও ধীরগতিতে চলছে।
কুশিগাঙের পুনরুজ্জীবনের জন্য মূলত দুটি দিকের কাজ প্রয়োজন: প্রথমত, অবৈধ ভরাট ও দখল বন্ধ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা; দ্বিতীয়ত, সেচ ও কৃষি ব্যবস্থার জন্য বিকল্প পানির উৎস নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সংরক্ষণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
কুশিগাঙের শীর্ণ দশা কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি দেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ জীবনের টেকসই উন্নয়নের বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই নদীর মতোই আরও বহু জলপথ শূন্যে পরিণত হতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]