ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস গুহায় পাওয়া প্রাগৈতিহাসিক বিশাল মুরগি, নতুন প্রজাতি ‘মেগাপোডিয়াস রোকুসি’
ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে হোবিট (হোমো ফ্লোরেসিয়েন্সিস) নামে পরিচিত প্রাচীন মানব প্রজাতির গুহা থেকে সাম্প্রতিক গবেষণায় এক নতুন প্রজাতির বিশাল পাখি আবিষ্কৃত হয়েছে। গুহার একক পায়ের হাড়ের টুকরো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই পাখিটিকে ‘মেগাপোডিয়াস রোকুসি’ নামকরণ করেছেন।
ফ্লোরেস দ্বীপের গুহা, যেখানে হোবিট মানবের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে প্যালিওন্টোলজিস্টরা ২০২৪ সালে প্রথমে হোবিটের হাড়ের সঙ্গে সঙ্গে পাখির হাড়ের টুকরো সংগ্রহ করেন। তবে সেই হাড়ের সঠিক পরিচয় তখন স্পষ্ট হয়নি। নতুন গবেষণায় হাড়ের মাইক্রোস্ট্রাকচার এবং ডিএনএ বিশ্লেষণ করে পাখির বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।
‘মেগাপোডিয়াস রোকুসি’ নামটি ল্যাটিন শব্দ ‘মেগা’ (বৃহৎ) এবং ‘পোডিয়াস’ (পা) থেকে গৃহীত, যা পাখির বিশাল পা ও দেহকে নির্দেশ করে। গবেষকরা জানিয়েছেন, এই পাখি আধুনিক মুরগির তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি ওজনের হতে পারে, এবং তার পা ও হাড়ের গঠন প্রমাণ করে যে এটি দ্রুত দৌড়াতে সক্ষম ছিল।
বৈজ্ঞানিক দল এই পাখিটিকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের শেষের দিকে, অর্থাৎ প্রায় ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ বছর আগে বসবাসকারী একটি প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই সময়ে ফ্লোরেস দ্বীপে হোবিট মানবের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বৃহৎ প্রাণীর বাস ছিল, যার মধ্যে ডাইনোসরের বংশধর এবং বিশাল কচ্ছপের নিদর্শনও পাওয়া গিয়েছে।
গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের প্যালিওন্টোলজি বিভাগে কাজ করা ড. রিনা সুতার্জা। তিনি উল্লেখ করেন, “এই পাখির হাড়ের গঠন এবং মেটাবলিক চিহ্নগুলো দেখায় যে এটি শিকারের জন্য শক্তিশালী পা ব্যবহার করত এবং সম্ভবত মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বাস করত। হোবিট মানবের সঙ্গে এর সমন্বয় আমাদের পূর্বপুরুষদের পরিবেশগত অভিযোজনের নতুন দিক উন্মোচন করে।”
এই আবিষ্কার আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্যালিওন্টোলজি ও বিবর্তনবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা একমত যে, হোবিট মানবের সঙ্গে এই বিশাল পাখির সহাবস্থান পূর্বের মানব-প্রাণী সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে, হোবিটের ছোট দেহের সঙ্গে এমন বড় পাখির সহাবস্থান কীভাবে সম্ভব হয়েছে, তা নিয়ে এখন গবেষণার নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, গুহার অন্যান্য স্তরে অতিরিক্ত হাড়ের টুকরো এবং ডিমের খোলসের অংশও পাওয়া গিয়েছে, যা ভবিষ্যতে ‘মেগাপোডিয়াস রোকুসি’ প্রজাতির পূর্ণাঙ্গ দেহের পুনর্গঠন সম্ভব করতে পারে। বর্তমানে দলটি গুহা থেকে সংগৃহীত সব নিদর্শন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ফ্লোরেস গুহা এখনই বৈশ্বিক পর্যটন ও গবেষণার নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সরকার গুহা সংরক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা করেছে, যাতে ভবিষ্যতে আরও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং পর্যটকদের নিরাপদ প্রবেশ নিশ্চিত করা যায়।
‘মেগাপোডিয়াস রোকুসি’ এর আবিষ্কার শুধু ইন্দোনেশিয়ার প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের সমৃদ্ধি নয়, মানব বিবর্তনের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যোগ করেছে। এই ধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে মানবের প্রাচীন পরিবেশ ও তার সঙ্গে সহাবস্থানকারী প্রাণীর জটিল সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করবে বলে আশা করা হচ্ছে।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]