অন্ধকারে ভয়ের অনুভূতি শরীর ও মনে কী প্রভাব ফেলে?
রাত গভীর হলে চারপাশ যখন নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তখন হঠাৎ কোনো খসখস শব্দ কিংবা জানালার পাশে অস্পষ্ট ছায়া দেখলে অনেকেই শিউরে ওঠেন। ভূতে বিশ্বাস থাকুক বা না থাকুক, এমন পরিস্থিতিতে মানুষের মনে ভয়ের উদ্রেক হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তবে ভয়ের এই বিষয়টি শুধুমাত্র মনের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব সরাসরি পড়ে আমাদের শরীরে। মস্তিষ্ক যখন কোনো বিপদের আশঙ্কা করে, তখন পুরো শরীরকে সতর্ক করার জন্য একগুচ্ছ জৈবিক প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়, যা আমাদের অজান্তেই ঘটে যায়।
বিজ্ঞান বলছে, যখন আমরা অন্ধকার বা অজানা কোনো কিছু দেখে ভয় পাই, তখন আমাদের মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিকভাবে অ্যামিগডালা নামক অংশকে সক্রিয় করে তোলে। এটি মূলত শরীরের বিপদের সংকেত প্রদানকারী কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। মস্তিষ্কের এই নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরে অ্যাড্রেনালিন এবং কর্টিসলের মতো হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এই রাসায়নিক পরিবর্তনগুলো আমাদের পেশিকে দ্রুত লড়াই করার জন্য বা পরিস্থিতি থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত করে তোলে। হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি দ্রুত হওয়া এবং হাতের তালু বা কপালে ঘাম ঝরতে শুরু করার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করে এই হরমোনগুলোই।
ভয়ের মুহূর্তে রক্তপ্রবাহের দিক পরিবর্তন ঘটে। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ পেশিগুলোতে অধিক পরিমাণে রক্ত সঞ্চালিত হয়, যাতে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়। এই প্রক্রিয়াটির কারণেই তখন হাত-পা ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। অনেকে আবার এই সময় গলা শুকিয়ে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতাও পান, কারণ ভয় পাওয়ার ফলে লালা গ্রন্থি থেকে লালা নিঃসরণ সাময়িকভাবে কমে যায়। অন্ত্রের নড়াচড়াও কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে, যার ফলে পেটে অদ্ভুত অস্বস্তি বা টান অনুভূত হতে পারে।
অনেকের ক্ষেত্রে মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাওয়ার অনুভূতিটিও বাস্তব। স্নায়ুতন্ত্রের সক্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে ত্বকের লোমকূপগুলোও সংকুচিত হয়, যা রোমাঞ্চ বা গায়ের কাঁটা দেওয়ার মতো অনুভূতির জন্ম দেয়। এটি মূলত আমাদের আদিম প্রবৃত্তি, যা হাজার বছর ধরে বিবর্তনের মাধ্যমে টিকে রয়েছে। বন্য পরিবেশে টিকে থাকার জন্য আদিম মানুষের মস্তিষ্ক সম্ভাব্য হুমকি দেখলেই শরীরকে প্রস্তুত রাখত, আর সেই একই প্রক্রিয়া আজকের আধুনিক জীবনে ভূতের ভয়ে বা অন্ধকার দেখে আমরা অনুভব করি।
তবে এই ভয়ের প্রভাব সবসময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একবার পরিস্থিতির কারণ শনাক্ত হয়ে গেলে বা ভয় কেটে গেলে শরীর দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার চেষ্টা করে। প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র এই পর্যায়ে শরীরকে শান্ত করার কাজ শুরু করে। যদি অতিরিক্ত ভয়ের কারণে মানসিকভাবে কেউ বেশি বিচলিত বোধ করেন, তবে ধীরে গভীর শ্বাস নেওয়া, পানি পান করা কিংবা চারপাশের পরিবেশে মনোযোগ দেওয়ার মাধ্যমে এই ভয় কাটানো সম্ভব। তবে ভয়ের কারণে শরীরের এই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াগুলোকে আমরা যদি বিজ্ঞানসম্মতভাবে বুঝতে পারি, তবে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকাই সহজ হয়।




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]