এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার সাম্প্রতিক ফলাফল কেবল শিক্ষার্থীদের মেধার পরিমাপক নয়, বরং এটি আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত গলদকেও সামনে নিয়ে এসেছে। সাফল্যের সংজ্ঞা যে কেবল একটি সার্টিফিকেটের ওপর নির্ভরশীল, সেই চিরাচরিত ধারণা এখন বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে। সমাজের একটা বড় অংশ মনে করে, ভালো ফলাফল করলেই কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে যাবে এবং জীবনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। কিন্তু এবারের পরীক্ষার ফলাফল সেই স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার এক গভীর ফারাক তৈরি করেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, এবারের পরীক্ষায় প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী পাস করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর এই অকৃতকার্য হওয়া দেশের শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বছরের পর বছর আমরা যে মুখস্থ নির্ভর এবং সার্টিফিকেট কেন্দ্রিক শিক্ষার চর্চা করে আসছি, তা কি আদতে কর্মোপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে? এমন প্রশ্ন এখন চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জ্ঞান আহরণ এবং সৃজনশীলতা বাড়ানো, কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দিন দিন একটি গোলকধাঁধায় পরিণত হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
অনেকেই মনে করেন, শিক্ষার সাথে চাকরির বাজারের সমন্বয়ের অভাব এই ফল বিপর্যয়ের একটি বড় কারণ। বর্তমান যুগ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছে, কিন্তু আমাদের পাঠ্যক্রম এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি অনেকটা সেই পুরনো ধাঁচেই রয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা কি তবে সময়ের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না, নাকি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাদের সেই সুযোগটুকু দিতে ব্যর্থ হচ্ছে? যখন ছয় লাখের মতো শিক্ষার্থী একযোগে অকৃতকার্য হয়, তখন কেবল শিক্ষার্থীর দায় নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। এখানে দায়ভার শিক্ষক, অভিভাবক এবং সামগ্রিক ব্যবস্থার ওপরও বর্তায়।
শিক্ষার নামে আমরা যে ইঁদুর দৌড় বা গোলকধাঁধায় বন্দি হয়ে আছি, তা থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। কেবল জিপিএ ফাইভ পাওয়া বা ভালো ফল করাই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। বরং দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষা এবং ব্যবহারিক শিক্ষার প্রসারে জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এবারের ফলাফল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা যদি আমাদের চিন্তাধারার পরিবর্তন না করি এবং শিক্ষাকে কেবল সার্টিফিকেট পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করি, তবে আগামী দিনে বেকারত্বের হার যেমন বাড়বে, তেমনি জাতীয় মেধায় ধস নামবে।
তাই এই ফল বিপর্যয়কে কেবল একটি সংখ্যার বিচারে না দেখে, একে একটি বড় ধরনের সংকেত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষা সংস্কারের কথা দীর্ঘদিন ধরে শোনা গেলেও এর বাস্তবায়ন এখনো ধীরগতিতে। পাঠ্যপুস্তকের বাইরের জগতের সাথে শিক্ষার সংযোগ স্থাপনের জন্য নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। সৃজনশীল মেধা বিকাশের সুযোগ রাখা, মুখস্থ নির্ভরতা কমানো এবং কারিগরি শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। নীতিনির্ধারকদের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি বাস্তবসম্মত ও আধুনিক কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা। নয়তো শিক্ষার এই গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের বড় একটি অংশ।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬ । ৪:১৪ অপরাহ্ণ