বাংলাদেশের কৃষি খাতের আধুনিকায়নে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করল বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বা বিনা। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির ক্যাম্পাসে আনুষ্ঠানিকভাবে গামা রশ্মি বিকিরণ কেন্দ্রের কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে দেশের কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই বিকিরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের গুণমান ঠিক রেখে দীর্ঘ সময় ধরে তা সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, যা মূলত অপচয় রোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
গামা রশ্মি বিকিরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে মূলত খাদ্যের গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রেখে অণুজীব ধ্বংস করা হয়, ফলে সাধারণ তাপমাত্রায় বা সাধারণ পরিবেশে যেসব পণ্য দ্রুত পচে যেত, সেগুলো এখন ১২ মাস পর্যন্ত অবিকৃত থাকবে। এই উদ্যোগের ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণ করতে পারবেন, যা বাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে মৌসুমী সবজি ও ফলমূলের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিনার মহাপরিচালক অনুষ্ঠানে প্রযুক্তিটির অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি জানান, এই কেন্দ্রটি বছরে প্রায় ৫৬ হাজার ৫০০ টন কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রাখবে। এর মাধ্যমে কৃষিপণ্যের সংগ্রহোত্তর যে অপচয় হয়, তা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সামগ্রিকভাবে এই উদ্যোগের ফলে বছরে প্রায় ৫৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার আর্থিক সাশ্রয় হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এটি কেবল কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে কৃষিপণ্য সংরক্ষণে গামা রশ্মি বিকিরণ একটি পরীক্ষিত ও কার্যকর পদ্ধতি। বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রয়োগ শুরু হওয়ায় এখন থেকে দেশীয় কৃষিপণ্যের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হলো। এছাড়া, খাদ্যদ্রব্য থেকে ক্ষতিকারক পোকা ও রোগজীবাণু দূর করার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণ ক্ষমতার কারণে রপ্তানির ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। কৃষিবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বিনার এই সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে আরও অনেক গবেষণামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা সহজতর হবে, যা সরাসরি কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিকিরণ কেন্দ্রটি পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে। পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নীতিমালা মেনেই এই পুরো প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের কেন্দ্রের সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব হলে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সব মিলিয়ে, বিনার এই গামা রশ্মি বিকিরণ কেন্দ্র দেশের কৃষি বিপ্লবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬ । ৪:১৪ পূর্বাহ্ণ