গণশুনানি কি কেবল এলপিজির দাম বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিকতা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ । ৯:১৫ অপরাহ্ণ

এলপিজি বা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের দাম সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রান্নার প্রধান জ্বালানি হিসেবে এর ওপর নির্ভরশীল দেশের সিংহভাগ পরিবার। কিন্তু এই প্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই জনমনে এক গভীর সংশয় ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। আইন অনুযায়ী গণশুনানির মাধ্যমে সব পক্ষের মতামত নেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে এই প্রক্রিয়াটি কেবল দাম বৃদ্ধির একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। গণশুনানির নামে যে নাটকীয়তা চলে, তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকের ঘাড়ে বাড়তি খরচের বোঝা চাপিয়ে দেয়।

পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক ঘটনার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই খাতে তিনটি বড় গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। অথচ বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রতিটি শুনানিতেই ঘুরেফিরে দাম বাড়ানোর সুপারিশ বা প্রস্তাব এসেছে। এর বিপরীতে দাম কমানোর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা এমন কোনো জোরালো প্রস্তাব সাধারণত দেখা যায় না। যখনই কোনো কোম্পানি বা সংস্থা শুনানিতে অংশ নেয়, তখন তাদের মূল এজেন্ডা থাকে ব্যয় বৃদ্ধি ও মুনাফার অজুহাত দেখিয়ে গ্যাসের দাম সমন্বয় বা বৃদ্ধির দাবি জানানো। গ্রাহক পর্যায়ে এই বর্ধিত মূল্য কতটুকু সহনীয় হবে বা তাদের জীবনযাত্রায় এর কী প্রভাব পড়বে, তা যেন গৌণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

সর্বশেষ শুনানির প্রসঙ্গটি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। সেখানে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ১৩৯ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। এই ধরনের বিশাল অঙ্কের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা চাপ সৃষ্টি করে, তা স্পষ্ট। গণশুনানির মূল চেতনা ছিল স্বচ্ছতা এবং ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ। কিন্তু যখন প্রতিটি শুনানিতেই কেবল দাম বাড়ানোর প্রস্তাব আসে এবং তা অনুমোদনের পথ প্রশস্ত হয়, তখন এই শুনানির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এটি কি কেবল কোম্পানিগুলোর বাড়তি মুনাফা নিশ্চিত করার একটি আইনি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর উচিত কোম্পানিগুলোর খরচ ও মুনাফার হিসাব নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা। কিন্তু বারবার একই ধারার দাম বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, যথাযথ যাচাই-বাছাই বা গ্রাহক স্বার্থ সুরক্ষায় ঘাটতি রয়ে গেছে। যদি প্রতিটি শুনানিতে দাম বৃদ্ধির সুপারিশই প্রাধান্য পায়, তবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? জ্বালানি খাতের অস্থিরতা কমাতে এবং সাধারণ মানুষের ওপর চাপ লাঘব করতে এই প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। কেবল দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত না নিয়ে, বরং কীভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে এলপিজি নিশ্চিত করা যায় এবং জ্বালানি কোম্পানিগুলোর অব্যবস্থাপনা কমিয়ে খরচ কমানো যায়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। অন্যথায়, গণশুনানি নামক এই প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের কাছে কেবল এক অসার ও হতাশাজনক অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে, যা কোনোভাবেই একটি জনবান্ধব অর্থনীতির কাম্য হতে পারে না।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন