ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লীতে কবরস্থানের গাছ কাটা নিয়ে বিরোধ, মাজারের খুঁটি ভাঙচুর

মোঃ সুজন আলী
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ । ১:৩১ অপরাহ্ণ

ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লীতে কবরস্থানের গাছ কাটা ও মাজারের সিমেন্টের খুঁটি এবং সাইনবোর্ড ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় এক পক্ষের বিরুদ্ধে গাছ কাটার অভিযোগ এবং অপর পক্ষের বিরুদ্ধে কেটে রাখা গাছ সরিয়ে নেওয়া ও মাজারের স্থাপনা ভাঙচুরের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করে পার্শ্ববর্তী আদর্শ বাজারের কাছ থেকে কর্তন করা গাছগুলো উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।

ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লী উপজেলাধীন শুখানপুকুরী ইউনিয়নের পশ্চিম শুখানপুকুরী (মুন্সিপাড়া) গ্রামে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পশ্চিম শুখানপুকুরী (মুন্সিপাড়া) এলাকায় ২ একর ৩৬ শতক খাস খতিয়ানভুক্ত জমির মধ্যে জান্নাতুল বাকী নামে একটি কবরস্থান রয়েছে। কবরস্থানটির বর্তমান সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মো. ইউনুছ আলী (৫০)। তিনি ওই গ্রামের সদরুপাড়ার মৃত সদরুর ছেলে।

কবরস্থানের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে প্রায় ১৮-১৯ বছর আগে মারা যাওয়া হযরত শাহ সুফি শেখ নমির উদ্দিন পীর সাহেবের কবর রয়েছে। তাঁর পিতার নাম মৃত হাবিল উদ্দিন মুন্সী। পরিবারের সদস্যরা ওই কবরকে মাজার শরিফ হিসেবে নামকরণ করেছেন। তাঁর ১০ ছেলের মধ্যে বর্তমানে ৯ জন জীবিত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অষ্টম ছেলে মো. বেলাল হোসেন ও তাঁর আপন খালাতো ভাই মো. মনছুর আলী মাজারের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৭ ও ২৮ অক্টোবর বেলাল হোসেন তাঁর অন্য ভাইদের নিয়ে মাজারের পাশে থাকা ছয়টি ইউক্যালিপটাস গাছ কেটে ফেলেন। বিষয়টি জানতে পেরে কবরস্থানের সভাপতি ইউনুছ আলীর বড় ভাই মো. দারাজ উদ্দিন (৬০) এবং কবরস্থান পরিচালনা কমিটির অন্য সদস্যরা সেখানে গিয়ে গাছ কাটতে বাধা দেন। এ সময় মাজারের লোকজন কাটা গাছগুলো সেখানে রেখেই চলে যান।

এরপর গত ২৯ অক্টোবর রাতের কোনো এক সময় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা কেটে রাখা গাছগুলো সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে মাজারের সিমেন্টের খুঁটি ও সাইনবোর্ড ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় মাজারের খাদেম মো. বেলাল হোসেন ও মো. মনছুর আলীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, কবরস্থানের সভাপতি ও পরিচালনা কমিটির সদস্যরা কেটে রাখা গাছগুলো নিয়ে গেছেন এবং মাজারের খুঁটি ও সাইনবোর্ড ভাঙচুর করেছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত পক্ষের লোকজন বলেন, ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে নির্বাচন থাকায় দিনভর নির্বাচনী কার্যক্রম শেষে তাঁরা বাড়িতে ফিরে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। রাতে সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। এ ঘটনার সঙ্গে তাঁরা কোনোভাবেই জড়িত নন। তাঁদের দাবি, হয়রানি ও ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষ নিজেরাই এমন ঘটনা সাজিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলেছেন।

কবরস্থানের সভাপতি ইউনুছ আলী জানান, কবরস্থানের সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য তাঁরা নিজেরাই এসব ইউক্যালিপটাস গাছ রোপণ করেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে গাছগুলো কবরস্থানের জায়গায় বেড়ে উঠছিল। তাঁদের দাবি, কমিটির সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা অনুমতি ছাড়াই মাজারের লোকজন ছয়টি গাছ কেটে ফেলেছেন। এতে তাঁরা বাধা দিলে পরবর্তীতে কাটা গাছ বিষয়ে নির্বাচনের পরে স্থানীয় ভাবে বসার কথা ছিল।

আরও বলেন, রাতের আঁধারে কাটা গাছ সরিয়ে নেওয়া এবং মাজারের খুঁটি ও সাইনবোর্ড ভাঙচুরের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

খবর পেয়ে ভূল্লী থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পুলিশ অভিযোগকারী, মাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। পরে পার্শ্ববর্তী আদর্শ বাজারের কাছ থেকে কর্তন করা গাছগুলো উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কবরস্থান ও মাজারের জায়গা, গাছপালা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ ও মতবিরোধ রয়েছে। এ ছাড়া মাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়েও স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে সাম্প্রতিক এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কবরস্থান ও মাজারের মতো ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর স্থাপনাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত নয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

ভূল্লী থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ঘটনাটি জানার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী আদর্শ বাজারের কাছ থেকে কর্তন করা গাছগুলো উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন