রাজশাহী নগরীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ, পার্ক, লেক ও ফ্লাইওভারের মতো জনাকীর্ণ এলাকাগুলোতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলা ও নগরী জুড়ে অন্তত ৩৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। অদ্ভুত ও আক্রমণাত্মক সব নাম ব্যবহারকারী এসব দলের সদস্যরা সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা হুমকিতে ফেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয়দের মধ্যে এসব কিশোরদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব গ্যাংয়ের নামকরণও বেশ অদ্ভুত। কোনোটির নাম ফালতু আবার কোনোটির নাম রাখা হয়েছে সিংহামের মতো সিনেমার চরিত্রের নামে। তবে নামের হাস্যরস থাকলেও তাদের কার্যকলাপ মোটেও হালকা নয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মূলত সামাজিক অবক্ষয় এবং অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারির অভাবেই কোমলমতি কিশোররা অপরাধ জগতের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা শুধু এলাকায় আধিপত্য বিস্তারই নয়, বরং নানা ধরণের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।
গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের তালিকার মধ্যে রয়েছে ছিনতাই, মারধর, সংঘবদ্ধ হামলা, চাঁদাবাজি এবং যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অপরাধ। এছাড়াও মাদক ব্যবসায় জড়ানোর অভিযোগও রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে দলবদ্ধ হয়ে মহড়া দেওয়া এবং স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও নারীদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনাও এখন নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাদের আচরণে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং অনেকেই এসব কিশোরদের ভয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না।
রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে মোটরবাইক চালানো এবং দলবদ্ধভাবে হৈ-হুল্লোড় করে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানো তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রায়শই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে নগরীর বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র এবং ফ্লাইওভারের মতো এলাকাগুলো এখন তাদের প্রধান আড্ডাস্থল। এসব স্থানে তারা সন্ধ্যা বা রাতের বেলায় জড়ো হয়ে অপরাধের পরিকল্পনা করে থাকে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
কিশোর অপরাধের এই বাড়বাড়ন্ত রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হলেও পরিস্থিতির স্থায়ী কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইনি ব্যবস্থা দিয়ে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কিশোরদের মাঠ পর্যায়ের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত রাখতে পারলে তাদের বিপথগামী হওয়া রোধ করা সম্ভব হতে পারে। একই সাথে অভিভাবকদের সচেতনতা ও সন্তানদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই কেবল এই কিশোর গ্যাং কালচার থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ । ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ