বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য দেশে যাওয়ার বিষয়টি যতটা আনন্দের, তার চেয়ে বেশি উদ্বেগের হয়ে দাঁড়ায় আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের আবদারের কারণে। আমেরিকা বা অন্য কোনো দূর দেশ থেকে কেউ দেশে যেতে চাইলে সেই খবর গোপন রাখতেই যেন বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এর পেছনে মূল কারণ হলো, দেশে যাওয়ার খবর পেলেই পরিচিতদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানোর অঘোষিত চাপ। ওষুধের বোতল, শিশুদের পোশাক, ডায়াবেটিস বা রক্তচাপ মাপার যন্ত্র থেকে শুরু করে আইফোন বা চকলেট—তালিকা যেন শেষ হওয়ার নয়। অনেকে আবার খুব হালকা জিনিসের দোহাই দিয়ে এমন সব প্যাকেট ধরিয়ে দেন, যা আদতে ওজনে বেশ ভারী হয়।
এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট পরিমাণ ওজনের মালামাল বহনের সুযোগ দেয়। একজন যাত্রী যখন নিজের পরিবারের জন্য কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে গিয়ে হিমশিম খান, তখন অন্যের দেওয়া বাড়তি মালামালের ভার সেই হিসাব এলোমেলো করে দেয়। অথচ যারা এই মালামাল পাঠাতে চান, তারা প্রায়ই ভুলে যান যে, বাড়তি ওজনের জন্য এয়ারপোর্টে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা অথবা শেষ মুহূর্তে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফেলে দিয়ে ওজন কমাতে হয়। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে অনেকেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশে যাওয়ার খবরটি চেপে যান। প্রবাসীদের স্বভাবজাত এই লজ্জার কারণে তারা মুখের ওপর ‘না’ বলতে পারেন না, যা তাদের জন্য বাড়তি মানসিক চাপের সৃষ্টি করে।
সম্প্রতি এমন একটি ঘটনার উদাহরণ দেখা যায়, যেখানে সপরিবার দেশে ফেরার সময় এক দম্পতির লাগেজের ওজন নিয়ে চরম বিড়ম্বনায় পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তাদের লাগেজগুলো পরিচিতদের দেওয়া উপহারসামগ্রীতে এমনভাবে পূর্ণ হয়েছিল যে, তা অনুমোদিত সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। ডালাসের বাঙালি কমিউনিটিতে খবর ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই তাদের বাড়িতে ভিড় করেছিলেন। সেই মুহূর্তে একজন সচেতন বন্ধু যখন জানতে চাইলেন তিনি কিছু পাঠাবেন কি না, তখন তিনি কৌশলে তা এড়িয়ে যান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, অন্যের বোঝা বইতে গিয়ে মূল যাত্রীর নিজের ভ্রমণে বিঘ্ন ঘটতে পারে। প্রবাসে বসবাসকারী অনেকেরই অভিজ্ঞতা রয়েছে, এয়ারপোর্টের কাউন্টারে গিয়ে অতিরিক্ত ওজনের মাশুল গুনতে গিয়ে কী ভয়াবহ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। সামান্য কয়েক কেজির জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে না চাইলে অনেক সময় শখের জিনিসপত্র ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। অনেক যাত্রী তখন বুদ্ধি করে ব্যাগ থেকে ভারী সোয়েটার বা জ্যাকেট বের করে গায়ে চাপিয়ে ওজন কমানোর চেষ্টা করেন, যা এক করুণ ও হাসির খোরাক জোগায়।
প্রবাসীদের এই লাগেজ বিড়ম্বনা কেবল ওজন বা টাকার অংক নয়, এটি সময়ের সাথে সাথে এক ধরনের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে। প্রিয়জনদের প্রতি টান থাকা সত্ত্বেও এয়ারপোর্টের এই কঠিন বাস্তবতা অনেককে বাধ্য করে নিজেদের আত্মীয়-পরিজন থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে। যারা দেশে উপহার পাঠান, তারা হয়তো বিষয়টি হালকা মনে করেন, কিন্তু ভুক্তভোগী প্রবাসীর কাছে এটি একটি বিশাল বোঝা। যথাযথ সচেতনতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া না থাকলে প্রবাসীদের এই ‘ওপারে আমার ঘর’ আর ‘এপারে প্রিয়জন’—এই দুইয়ের টানাপোড়েন কখনোই শেষ হবে না। প্রতিটি প্রবাসীর যাত্রাপথ যেন আনন্দময় ও নিরুদ্বেগ হয়, সেজন্য আত্মীয়-স্বজনদেরও উচিত তাদের এই সীমাবদ্ধতার প্রতি সহমর্মী হওয়া।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ । ৮:১৪ পূর্বাহ্ণ