আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা বেশ প্রচলিত রয়েছে যে, কুকুর পোষা পাপের কাজ এবং বিড়াল পোষা একটি সুন্নত বা পুণ্যময় আমল। এই বিশ্বাসের কারণে অনেকে কুকুরকে এড়িয়ে চলেন বা ঘৃণার চোখে দেখেন, আবার বিড়ালকে পরম যত্নে বাড়িতে স্থান দেন। কিন্তু এই ধারণাটি ইসলামী আইন বা শরীয়াহর আলোকে কতটা সঠিক, তা যাচাই করা প্রয়োজন। আসলে ইসলামে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বা অযথা ঘৃণা প্রদর্শনের কোনো স্থান নেই।
ইসলামের দৃষ্টিতে কুকুর বা বিড়াল কোনোটিই পাপ বা পুণ্যের মাপকাঠি নয়। বরং ইসলামে প্রতিটি প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিড়ালের বিষয়ে প্রচলিত ধারণার কারণ হলো, রাসূলুল্লাহ (সা.) বিড়াল পছন্দ করতেন এবং সাহাবীদের মধ্যে কেউ কেউ বিড়াল পুষতেন বলে ইতিহাসে বর্ণিত আছে। তবে বিড়াল পোষা ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কোনোটিই নয়। এটি মূলত একটি ব্যক্তিগত পছন্দ বা শখের বিষয়। কেউ যদি বিড়াল পোষেন এবং সেটির সঠিক যত্ন ও খোরপোশের ব্যবস্থা করেন, তবে তিনি সওয়াব পেতে পারেন। কিন্তু এটিকে সরাসরি সুন্নত মনে করা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝির ফল।
কুকুরের বিষয়ে আমাদের সমাজে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তার পেছনে বেশ কিছু ভুল ব্যাখ্যা কাজ করে। অনেক মানুষ মনে করেন কুকুর স্পর্শ করা বা কুকুর পালন করা পুরোপুরি হারাম। অথচ ফিকহ শাস্ত্রের বিশদ আলোচনায় দেখা যায়, প্রয়োজনের খাতিরে কুকুর পালনের অনুমতি রয়েছে। যেমন, নিরাপত্তার প্রয়োজনে, কৃষিকাজে বা শিকারের কাজে কুকুর ব্যবহারের বৈধতা ইসলামে রয়েছে। তবে বিনা প্রয়োজনে ঘরের ভেতরে কুকুর রাখা ফেরেশতাদের রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হতে পারে বলে অনেক আলেম অভিমত দিয়েছেন। তাই বলে কুকুরকে ঘৃণা করা বা তাকে আঘাত করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
ইসলামের ইতিহাস ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি প্রাণীদের প্রতি দয়ালু ছিলেন। এমনকি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়ে এক নারী জান্নাত লাভ করেছিলেন—এমন ঘটনা হাদীসের কিতাবগুলোতে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। এই ঘটনাটিই প্রমাণ করে যে, কুকুর কোনো ঘৃণিত প্রাণী নয়, বরং আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শন করা ইসলামের একটি অন্যতম শিক্ষা। তাই কুকুরকে অকারণে ঘৃণা করা বা তাকে কষ্ট দেওয়া ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী।
আজকের সময়ে কুকুর ও বিড়াল পোষা মূলত মানুষের জীবনধারা ও শখের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলাম শখের এই বিষয়গুলোকে নিষিদ্ধ করেনি, তবে তা যেন ধর্মীয় রীতিনীতি বা পবিত্রতা রক্ষার ক্ষেত্রে অন্তরায় না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে। কুকুর বা বিড়াল পোষার ক্ষেত্রে মূল সতর্কতা হলো তাদের যথাযথ খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। ইসলামে অকারণে কোনো প্রাণীকে আটকে রেখে কষ্ট দেওয়া নিষেধ। যদি কেউ প্রাণী পুষতে গিয়ে তার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে বা তাকে অভুক্ত রাখে, তবে তা অবশ্যই পাপের কাজ হিসেবে গণ্য হবে।
পরিশেষে বলা যায়, কুকুর পোষা পাপ এবং বিড়াল পোষা সুন্নত—এ ধরনের অতিরঞ্জিত ও ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। ইসলামের শিক্ষা হলো প্রতিটি প্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। বিড়াল বা কুকুর কোনোটিই ধর্মীয় ইবাদতের শর্ত নয়। বরং এগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িত প্রাণী। এদের প্রতি দয়া ও মায়া দেখানো মানবিক গুণ। সমাজ ও ধর্মীয় আলোচনায় এ ধরনের বিষয়গুলোতে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন যাতে মানুষ ভ্রান্ত বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে অহেতুক কোনো প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন না করে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ