অভাবের সংসার সাজানোর স্বপ্ন ছিল মনিরুলের, ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:১৫ অপরাহ্ণ

অভাবের তাড়নায় একসময় মানুষ পাড়ি জমায় ভিনদেশে, নতুন জীবনের আশায় বুক বাঁধে। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর গ্রামের যুবক মনিরুল ইসলামও ব্যতিক্রম ছিলেন না। সংসারের হাল ধরার স্বপ্ন নিয়ে সুদূর মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি তার। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়ে এখন নিথর দেহ হয়ে ফিরলেন তিনি। মা-বাবা ও স্বজনদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে রায়পুর গ্রামের বাতাস। কফিনবন্দী হয়ে দেশে ফেরার মাধ্যমে শেষ হলো মনিরুলের বিদেশযাত্রার সব স্বপ্ন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন দিশেহারা তার স্বজনেরা। বিদেশ যাওয়ার সময় যে মানুষটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আজ তাকে শেষবারের মতো দেখতে ভিড় করছেন এলাকাবাসী। এটি কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের মর্মান্তিক উপাখ্যান।

মনিরুলের অকাল প্রয়াণে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। অভাব ঘোচানোর অদম্য ইচ্ছাই তাকে বাধ্য করেছিল অনিশ্চিত এক গন্তব্যে যাত্রা করতে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, মনিরুল বিদেশে যাওয়ার পর নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তার পাঠানো উপার্জনের টাকায় সংসারের অভাব কিছুটা ঘুচতেও শুরু করেছিল। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে অকালেই থেমে গেল তার পথচলা। পরিবার এখন শোকে মুহ্যমান। তারা এখন কেবলই শোকের সাগরে ভাসছে। তার মৃত্যুতে এলাকাবাসীও গভীরভাবে শোকাহত। প্রবাসে গিয়ে লাশ হয়ে ফেরার এই ঘটনা আরও একবার আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবন ও জীবিকার কঠিন বাস্তবতাকে। পরিবারের পক্ষ থেকে মৃতদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী আইনি বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এই শোক কাটিয়ে ওঠা বা মনিরুলের শূন্যতা পূরণ করার ক্ষমতা এই পরিবারের নেই, কিন্তু সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষাও আজ তাদের কাছে ফুরিয়ে গেছে।

দেশের সাধারণ মানুষের জন্য প্রবাসজীবন যে কতটা অনিশ্চয়তার, তা আবারও এই ঘটনায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ভাগ্য ফেরাতে গিয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। মনিরুলের মতো আরও অনেক তরুণ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায়, কিন্তু সবার ভাগ্যে সফলতা জোটে না। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিদেশগামী কর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে আরও জোরালো পদক্ষেপের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। একটি দরিদ্র পরিবারের শেষ আশ্রয়স্থল এভাবে হারিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় সমাজসেবীরাও তাদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। শোকাবহ এই পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বজনদের এখন বড় প্রয়োজন মানসিক ও আর্থিকভাবে সহায়তার। মনিরুলের মৃত্যু যেন এলাকার সব মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তার মা-বাবা এখন বিলাপ করছেন সন্তানের জন্য। তাদের সব আশা-ভরসা এখন কেবল স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ।

মনিরুলের এই অকাল প্রয়াণ স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝেও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একইসাথে, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনমনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিদেশগামী কর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি সুরক্ষার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে যারা দুর্গম বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজ করতে যান, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মৃতদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর এবং যথাযথ সম্মানের সাথে দাফনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অভাবের সংসারে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখা মনিরুল আর নেই, কিন্তু তার এই মর্মান্তিক পরিণতি যেন অন্যদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটাই এখন কাম্য। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে, কীভাবে এমন সম্ভাবনাময় তরুণদের জীবন এভাবে নিভে যাওয়া রোধ করা যায়।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন