এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়াল জাতিসংঘ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ । ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকা বাংলাদেশের জন্য সুখবর নিয়ে এসেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের প্রস্তুতির সুবিধার্থে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর ফলে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে ২০২৯ সাল পর্যন্ত এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে বিদ্যমান সকল আন্তর্জাতিক সুবিধা ভোগ করার সুযোগ পাবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং কোভিড-১৯ পরবর্তী চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আবেদনের প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় এক নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। সাধারণত এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য দেশগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়, যার মধ্যে বাণিজ্য সুবিধা, ঋণ সহায়তা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের অগ্রাধিকার বজায় থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও তাদের উত্তরণ প্রক্রিয়াকে আরও সুসংহত করতে বাড়তি সময়ের প্রয়োজনীয়তা বোধ করছিল। তিন বছরের এই বর্ধিত সময়কালকে দেশের অর্থনীতিবিদরা অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, কারণ এতে রপ্তানি বাজারে বিদ্যমান বিশেষ সুবিধাগুলো আরও কিছুকাল ধরে রাখা সম্ভব হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে যে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা ভোগ করে, এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে তা আর সরাসরি পাওয়া যায় না। যদিও উত্তরণ পরবর্তী সময়ে জিপিএস প্লাস সুবিধার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তবুও তিন বছরের অতিরিক্ত সময় দেশের বেসরকারি খাত এবং রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোকে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প এবং অন্যান্য উদীয়মান খাতের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে পণ্যের বহুমুখীকরণ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো প্রয়োজন।

সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সকল শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে উত্তরণ প্রক্রিয়া যাতে দেশের অর্থনীতির ওপর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেজন্য সরকার শুরু থেকেই অত্যন্ত সতর্ক ছিল। জাতিসংঘের এই বাড়তি সময় প্রাপ্তির ফলে টেকসই উত্তরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারবে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জগুলো আসার কথা ছিল, সেগুলোর মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতেও বাড়তি তিন বছর বেশ সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি দেশের জন্য কেবল অর্থনৈতিক মাইলফলক নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দেশের সম্মান ও নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক। তবে উত্তরণের পরবর্তী সময়ে যেসব বাণিজ্য সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ, তা পূরণের জন্য সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই বাড়তি তিন বছর সময় পাওয়ার ফলে ওই সব আলোচনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে এবং কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাণিজ্য সুবিধাগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারবে।

বিশ্ব অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি এবং ভূ-রাজনীতির বর্তমান সমীকরণ বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই ঘোষণার মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন আগামী ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে সরকার ও বেসরকারি খাত কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করে, সেটিই হবে আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশ এই সুযোগকে পূর্ণরূপে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে নিজেদের রূপান্তরের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন