রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে বয়ে চলা তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক সাবেক কর্মকর্তার মরদেহ। কে এম তাহসিফ সৌরি নামের এই সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্টের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিবার ও পরিচিত মহলে। গত কয়েকদিনের নিখোঁজ অবস্থার অবসান ঘটেছে তার প্রাণহীন দেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে। এই ঘটনাটি এখন রাজধানীর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ মৃত্যুর কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা অস্পষ্টতা।
নিখোঁজ হওয়ার ঠিক পরদিনই তুরাগ নদের পানিতে ভেসে ওঠে তার মরদেহ। স্থানীয়রা মরদেহটি দেখতে পাওয়ার পরপরই পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়াটি বেশ দ্রুতই সম্পন্ন হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহতের পকেটে থাকা আইফোন এবং হাতে থাকা ঘড়ি দেখে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরিচয় পাওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয় এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় পরিচয় শনাক্ত করতেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়, তবে এক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ তদন্তের পরবর্তী ধাপগুলো সহজতর করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগের তীর এখন হত্যাকাণ্ডের দিকে। তারা দাবি করছেন, এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা হতে পারে না। তাদের সন্দেহের মূলে রয়েছে তাহসিফ সৌরির নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি এবং তার মৃত্যুর ধরণ। স্বজনরা দাবি করছেন, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে তুরাগ নদে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ তদন্তের খাতিরে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে, প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে ভিন্ন এক পরিস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পুলিশ জানিয়েছে যে, প্রাথমিকভাবে মরদেহে কোনো ধরণের দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এই তথ্যটিই এখন তদন্তকে দ্বিধাবিভক্ত করে তুলেছে। দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না থাকায় এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যার নেপথ্যে কোনো বিষক্রিয়া বা অন্য কোনো কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে, তা নিয়ে নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করা যাচ্ছে না। পুলিশ এখন চূড়ান্ত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছে। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলে এবং রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা।
যে কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যু বা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ সাধারণত পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে থাকে। তদন্তের স্বার্থে নিহতের শেষ সময়ের চলাফেরা, তার সাথে কারো শত্রুতা ছিল কি না অথবা নিখোঁজ হওয়ার আগে কার সাথে তার যোগাযোগ হয়েছিল, সে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও তদন্তাধীন বিষয়ে কোনো কিছু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে এটি নিশ্চিত যে এই ঘটনার পেছনে কোনো প্রভাবশালী বা ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রাজধানীতে নদীকেন্দ্রিক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নতুন নয়, তবে একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার এভাবে মৃত্যু বিষয়টি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চিন্তার খোরাক দিচ্ছে।
বর্তমানে পুরো বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তদন্ত করা হচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে কি না, তা জানা না গেলেও, পুলিশ তাদের নিজস্ব নিয়মেই অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রেকর্ড করেছে। এখন সবার নজর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের দিকে। এই প্রতিবেদনই হয়তো শেষ পর্যন্ত বলে দেবে, বিমানবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তা আসলেই কি কোনো অপরাধের শিকার হয়েছেন নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো ঘটনা। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করা হবে এবং আইনের আওতায় আনা হবে। তদন্তের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েই বেরিয়ে আসবে সত্যের স্বরূপ।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ । ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ