রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার ধলপুরে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) একটি অভিযান চলাকালীন গলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৮ বছর বয়সী মারুফ ওরফে দুখু মিয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি বিবৃতি দিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটি কেবল শোক প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করেনি, বরং ঘটনার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। বৃহস্পতিবার সংস্থাটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে ঘটনার সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর দুপুরে এসআরবির সদস্যরা ধলপুর এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে অভিযান পরিচালনা করছিলেন। সে সময় গুলিবর্ষণের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারুফের মৃত্যু ঘটে। স্থানীয় পর্যায়ে খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। এইচআরএসএস তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধান এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছে। তাদের ভাষ্যমতে, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের উদ্দেশ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলেও, সেখানে প্রাণহানির মতো ঘটনা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেশাদারিত্ব ও কার্যপদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস কেবল একটি বিবৃতিতেই থেমে থাকেনি, বরং তারা এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সাত দফা দাবি উপস্থাপন করেছে। এই দাবিগুলোর মূল লক্ষ্য হলো ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা। সংস্থার পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং গুলি চালানোর ক্ষেত্রে যে আন্তর্জাতিক প্রটোকল ও আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা কি সেখানে মানা হয়েছিল—তা খতিয়ে দেখার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন কমিশন গঠন করতে হবে। এছাড়া, নিহত তরুণের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবিও তোলা হয়েছে।
নিহত তরুণের স্বজনদের আহাজারিতে ধলপুর এলাকার পরিবেশ এখন ভারী হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মারুফ সে সময় ওই এলাকায় উপস্থিত ছিল। তবে ঠিক কী পরিস্থিতিতে সে এসআরবির গুলির শিকার হলো, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। অনেকে দাবি করছেন, কোনো বড় ধরনের গোলযোগ বা সংঘর্ষের আগেই গুলি চালানোর ঘটনাটি অস্বাভাবিক। এইচআরএসএস মনে করছে, যতক্ষণ পর্যন্ত ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত না হবে, ততক্ষণ প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা অসম্ভব। তারা বিচার বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত সদস্যদের সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্তের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এসআরবির মতো বিশেষায়িত বাহিনীর কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সেখানে তাদের হাতেই যদি সাধারণ নাগরিকের প্রাণ যায়, তবে সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রতিটি মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যা করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এইচআরএসএসের সাত দফা দাবির মধ্যে অন্যতম হলো, ভবিষ্যতে যেন এমন অভিযান পরিচালনার সময় জনবসতিপূর্ণ এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয় এবং অস্ত্র ব্যবহারের নীতিমালা আরও কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়।
এদিকে, ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাচ্ছে। এইচআরএসএসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এটি মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের এক বড় ধরনের লঙ্ঘন হতে পারে যদি যথাযথ তদন্ত না হয়। তারা আশা করছে, সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে যে কেউ—সে যে বাহিনীর সদস্যই হোক না কেন—তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এই প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কি না, তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়নি। তবে সচেতন মহল মনে করছে, ঘটনার সত্যতা প্রকাশ পাওয়া এখন সময়ের দাবি।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:১৪ অপরাহ্ণ