রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জাপানের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:১৪ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে আরও গভীর হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় জাপান সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশটির শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জাপানি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বুধবার জাপানের স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন বা জেটরো’র প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমুর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।

বৈঠকের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে রপ্তানি পণ্যের বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য আনা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশ মূলত নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর নির্ভর করে রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য রপ্তানি পণ্যের ঝুড়ি বাড়ানো অপরিহার্য। এই প্রক্রিয়ায় জাপানের মতো উন্নত প্রযুক্তি ও শক্তিশালী বাজার ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন দেশের অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, জাপানি উদ্যোক্তারা যদি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ করেন, তবে তা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হবে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে।

জেটরো’র প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও সম্প্রসারণ করার মাধ্যমেই বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্রগুলো উন্মোচন করা সম্ভব। তিনি জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। বাংলাদেশের বাজারে জাপানি পণ্যের দীর্ঘদিনের গ্রহণযোগ্যতা এবং জাপানি বিনিয়োগের প্রতি মানুষের আস্থার বিষয়টিও তিনি আলোচনায় উত্থাপন করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের শিল্পায়ন প্রক্রিয়ায় জাপানের সক্রিয় অংশগ্রহণ স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

এরই মধ্যে জাপানি ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশনের বা জেবিআইসির গভর্নরের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশে জেবিআইসির একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যালয় খোলার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জেবিআইসি মূলত জাপানের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অর্থায়নের অন্যতম প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি স্থানীয় কার্যালয় স্থাপন করা হলে তা জাপানি উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আরও উৎসাহিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবটি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন জেবিআইসির গভর্নর। তিনি জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশে জেবিআইসির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কার্যালয় খোলার বিষয়টি তারা অত্যন্ত গুরুত্ব ও সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করছেন। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যকার আর্থিক ও ব্যবসায়িক লেনদেনের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও গতিশীল হবে।

বৈঠকগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর এসব প্রস্তাব ও আলোচনার প্রেক্ষিতে জাপানি পক্ষ থেকে বেশ ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। তারা বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং শিল্প খাতের আধুনিকায়নে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর এবং শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বরাবরই অত্যন্ত সুদৃঢ়। জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী এবং বিনিয়োগকারী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। জাইকা এবং জেটরোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে জাপানের সহযোগিতা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন এই উদ্যোগ—অর্থাৎ রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জাপানের সহযোগিতা চাওয়া এবং জেবিআইসির কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব—নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাদেশ সরকার বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজতর করতে বিভিন্ন নীতিগত সংস্কার করেছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে জাপানি ব্যবসায়ীরা যেন বাংলাদেশে নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন, তার জন্য সব ধরণের প্রশাসনিক সহায়তার নিশ্চয়তা প্রদান করেন তিনি। সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর এই জাপান সফর বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনে অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি শুধুমাত্র বর্তমান সম্পর্কেরই প্রতিফলন নয়, বরং আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের অর্থনৈতিক মেলবন্ধনের এক বলিষ্ঠ অঙ্গীকার।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন