বর্তমান সময়ে মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যকার সম্পর্কের সমীকরণটি বেশ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কৈশোরের সন্ধিক্ষণে থাকা সন্তানদের মানসিক পরিবর্তনগুলো বুঝতে না পারা বা তাদের সময় না দেওয়া পরিবারগুলোতে একধরনের নীরব দূরত্বের সৃষ্টি করছে। এই দূরত্ব ঘুচিয়ে সন্তানকে একটি নিরাপদ আশ্রয় প্রদানের গুরুত্ব নিয়ে সম্প্রতি একটি বিশেষ পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেন কীভাবে মা-বাবার সচেতন আচরণ ও শোনার সংস্কৃতি একটি শিশুর ভবিষ্যৎ পথচলাকে সুনিশ্চিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, সন্তানের বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপেই তাদের মনে নানা প্রশ্ন ও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এই সময়ে সন্তান যদি পরিবারের ভেতরেই নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ না পায়, তবে সে একাকীত্বে ভোগে। পরিবার যখন সন্তানের কাছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়, তখনই সে বাইরের ক্ষতিকর মাধ্যম বা ভুল সঙ্গের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। মানসিক স্বাস্থ্যের এই সংবেদনশীল বিষয়টি মাথায় রেখে অভিভাবকত্ব বা প্যারেন্টিংয়ের ধারণায় পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।
আলোচনায় উঠে এসেছে, বেশিরভাগ মা-বাবাই সন্তানকে উপদেশ দিতে বা শাসন করতে বেশি আগ্রহী হন। কিন্তু কিশোর বয়সে সন্তানের জন্য এটি সবসময় কার্যকর নয়। বরং এই বয়সের ছেলেমেয়েরা এমন একজন মানুষ চায়, যে তার মনের কথাগুলো কোনো বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই শুনবে। যখন সন্তান তার বিষণ্নতা বা অস্থিরতার কথা মা-বাবার কাছে খুলে বলে, তখন অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব হলো তাকে ধৈর্য ধরে শোনা। অনেক ক্ষেত্রেই সন্তান সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধান চায় না, কেবল চায় কেউ তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনুক। যখন তারা দেখে যে মা-বাবা তার কথাগুলো গুরুত্ব সহকারে শুনছেন, তখন এক ধরনের মানসিক স্বস্তি তৈরি হয়। এই স্বস্তিই তাকে বাইরের বিভ্রান্তিকর পরিবেশ থেকে নিরাপদ রাখে।
বিশেষজ্ঞরা আরও পরামর্শ দিয়েছেন যে, প্যারেন্টিং কেবল ভালো খাওয়ানো বা ভালো স্কুলে পড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত অভিভাবকত্ব হলো সন্তানের মনের ভাষা বুঝতে পারা। যদি মা-বাবা সন্তানের মনের অবস্থা বুঝতে পারেন, তবে বড় কোনো সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই ঘরের ভেতরেই তার সমাধান সম্ভব। এতে সন্তানের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং সে যেকোনো বিপদে সবার আগে মা-বাবার ওপর আস্থা রাখতে শেখে। বর্তমান সময়ের মাদকাসক্তি বা প্রযুক্তি নির্ভরতার কুফল থেকে সন্তানকে দূরে রাখতে চাইলে পারিবারিক এই বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার কোনো বিকল্প নেই।
আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা একটি বাস্তবসম্মত বার্তা দিয়েছেন—সন্তানকে শাসন করার চেয়ে তাকে বোঝার চেষ্টা করা বেশি জরুরি। শাসন অনেক সময় দূরত্ব সৃষ্টি করে, কিন্তু ভালোবাসা ও মনোযোগ সম্পর্ককে গভীর করে। পরিবার যদি সন্তানের জন্য একটি আবেগীয় নিরাপদ বলয় তৈরি করতে পারে, তবে সে বাইরের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার শক্তি অর্জন করে। মা-বাবা যখন সন্তানের বন্ধু হয়ে উঠতে পারেন, তখন সন্তানের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশে কমে আসে। সামগ্রিকভাবে, সন্তানের মানসিক বিকাশে মা-বাবার ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
পরিশেষে, সন্তানদের সঙ্গে এই যোগসূত্র স্থাপন করা একদিনের বিষয় নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। নিয়মিত আলাপচারিতা, একে অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং সন্তানের নিজস্ব মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি গড়তে পারলে পারিবারিক অশান্তি ও অস্থিরতা অনেকটা কমে আসবে। চিকিৎসকদের মতে, আজকের এই সচেতন অভিভাবকত্বই আগামী দিনের একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজের ভিত্তি স্থাপন করবে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:১৪ অপরাহ্ণ